সংসারের অভাব ঘোচাতে ও মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের যুবক আসিফ খান (২৮)। দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারানো সেই রেমিট্যান্স যোদ্ধার মরদেহ অবশেষে দেশে ফিরছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল ১১টায় মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে কম্বোডিয়া থেকে আসিফের মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আসিফের বাবা আলী হোসেন মোল্লা।
আসিফ চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়িয়া ইউনিয়নের কর্চাডাঙ্গা গ্রামের লাইনপাড়ার আলী হোসেন মোল্লা ও আছিয়া বেগমের একমাত্র সন্তান।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সংসারের দৈন্যদশা ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্থানীয় দালাল জাকিরের সহায়তায় বিদেশে পাড়ি জমান আসিফ। তাকে মরক্কোতে পাঠিয়ে কৃষিকাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়।
আসিফের পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় দালাল খলিলের সহযোগী আদম ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের মিষ্টি প্রতিশ্রুতিতে ভালো কাজের আশায় বিদেশে যান তিনি। তবে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর আশ্বাস দেওয়া কাজের কোনো বাস্তবতা খুঁজে পাননি।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় যাওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় কর্মস্থলে ইলেকট্রনিক্সের কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন আসিফ। পরে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৮ মার্চ তার মৃত্যু হয়।
আসিফের বাবা আলী হোসেন মোল্লা জানান, তার ছেলে কখনো বিদ্যুতের কাজের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলেন না। পরিবারের অভিযোগ, দালালের প্রতারণার কারণে তাকে প্রতিশ্রুত কাজের বদলে ভিন্ন কাজে যুক্ত করা হয়েছিল।
ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে পরিবারের প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাবা আলী হোসেন মোল্লা। তিনি বলেন, মরক্কোয় নিয়ে কৃষিকাজ দেওয়ার কথা বলে তার ছেলেকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বিমানে ওঠার পর কম্বোডিয়ার ভিসা হাতে দেওয়া হয়।
আলী হোসেন মোল্লার অভিযোগ, মরক্কোর কথা বলে তার ছেলেকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে যাওয়ার এক মাসের মাথায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার মৃত্যু হয়। ছেলেকে হারিয়ে এখন তারা নিঃস্ব।
ছেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকেই শোকে পাথর হয়ে আছেন বাবা আলী হোসেন মোল্লা ও মা আছিয়া বেগম। ছেলের মরদেহ দেশে ফেরাতে বাবা ইতোমধ্যে ঢাকায় গিয়ে প্রয়োজনীয় সরকারি কাগজপত্রের কাজ সম্পন্ন করেছেন।
মরদেহ দেশে ফেরানোর আশ্বাস মিললেও দিনের পর দিন অপেক্ষার পর বৃহস্পতিবার দেশে ফিরছে আসিফের নিথর দেহ। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে কাতর গোটা পরিবার ও গ্রামবাসী।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মা আছিয়া বেগম বলেন, “আমাদের ছেলে তো আর কোনোদিন বেঁচে ফিরবে না। আল্লাহ আমাদের সেই সুখ দেননি। শেষবারের মতো আমরা আমাদের বাবাটার মুখটা একটু দেখে মরতে চাই। আমাদের একটাই মিনতি—আমার ছেলের লাশটা দেখে নাড়ীপোতা বাড়িতে মাটি দিতে চাই।”
আলী হোসেন মোল্লা বলেন, “স্বপ্ন ছিল বিদেশ গিয়ে খেটে উপার্জন করে দেশে থাকা পরিবারে স্বচ্ছলতা আনবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। আমার ছেলে প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা হয়ে দেশে ফিরছে, তবে জীবিত নয়—নিথর দেহে কফিনবন্দি হয়ে।”
আসিফের পরিবার এখন ছেলের মরদেহ শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষায়। বিদেশে ভালো কাজের আশ্বাস দিয়ে দালালের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে এমন প্রতারণা আর কোনো পরিবারকে যেন নিঃস্ব না করে—এমনটাই প্রত্যাশা স্বজন ও স্থানীয়দের।
কেকে/ এমএস