একটি চাকরির চিঠি যখন একটি অভাবী পরিবারের অন্ধকার ঘরে আশার প্রদীপ জ্বেলেছিল, ঠিক তখনই আইনি জটিলতার কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল এক তরুণের স্বপ্নে। বাবার নামে কোনো জমি নেই–কেবল এ একটি মাত্র কারণে পুলিশ ভেরিফিকেশনে হাতছাড়া হতে বসেছিল স্বপ্নের চাকরিটি। তবে সেই অন্ধকারের মুখে পরম আলো হয়ে দেখা দিলেন এক প্রতিবেশী হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ধর্মের কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে, কোনো বিনিময় ছাড়াই নিজের এক শতক জমি তুলে দিলেন সেই তরুণের হাতে; নিজে বহন করলেন রেজিস্ট্রেশনের পুরো খরচও।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার নিভৃত এক গ্রামে রচিত হলো অসাম্প্রদায়িক মানবিকতার এ অমর উপাখ্যান। যেভাবে থমকে গিয়েছিল স্বপ্ন, দীর্ঘদিন ধরে একটি ছোট ভাড়া বাসায় বসবাস করছে পরিবারটি। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে তিল তিল করে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন তরুণটি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়ে যখন পরিবারের মুখে হাসি ফুটেছিল, তখনই নেমে আসে দুঃসংবাদ। ব্যাংক চাকরির নিয়ম অনুযায়ী পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় জানা যায়, তরুণের বাবার নামে কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই। নিয়ম-কানুনের যাঁতাকলে পিষে বাদ পড়ার আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। অসাম্প্রদায়িক ভালোবাসার হাত বাড়ানো এক তরুণের স্বপ্ন এভাবে নিভে যাবে–তা মেনে নিতে পারেননি প্রতিবেশী ওই হিন্দু ভদ্রলোক।
সংকটের কথা জানতে পেরে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসেন তিনি। এক শতক জমি ভালোবাসার উপহার হিসেবে তুলে দেন তরুণটির নামে। যেন কোনো ঘাটতি না থাকে, তাই রেজিস্ট্রেশনের যাবতীয় খরচও মিটিয়ে দেন নিজের পকেট থেকে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছ জুড়ী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘ছেলেটির পরিবারের এ চরম সংকটের কথা শুনে প্রতিবেশী হিন্দু ভদ্রলোক যেভাবে স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে এসেছেন, তা সত্যিই বিরল। তিনি কোনো বিনিময় ছাড়া জমিটি দান করেছেন এবং রেজিস্ট্রেশন খরচও নিজে দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়ায় এখনই নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না, তবে মানুষের ওপর মানুষের এ বিশ্বাস আমাদের মুগ্ধ করেছে।’
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে পুরো মৌলভীবাজারে বইছে প্রশংসার জোয়ার। ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে, সম্পর্কের অতল গভীরতাকে সম্মান জানিয়ে প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানোর এ দৃশ্য মানুষকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখাচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সম্প্রীতি কেবল মুখে বলার বিষয় নয়, জুড়ীর এ মাটি আজ তা সত্যি করে দেখাল। এক তরুণের মেধা আর এক প্রতিবেশীর ভালোবাসায় পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে একটি লালিত স্বপ্ন।
কেকে/এআই