বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মধ্যবিত্ত হলো সমাজের সেই মেরুদণ্ড, যারা না পারে টিসিবির ট্রাকের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ধাক্কাধাক্কি করতে, না পারে সুপারশপ থেকে চোখ বন্ধ করে ট্রলি ভরে বাজার করতে। তাদের বাস এক অদ্ভুত ত্রিশঙ্কু দশায়। লোকলজ্জা, সম্মান আর ‘কী ভাববে লোকে’ এই অদৃশ্য শৃঙ্খলে তারা বাঁধা। মাসের ১ তারিখে যে বেতনটা হাতে আসে, ৫ তারিখ পেরোতে না পেরোতেই তা বাড়িভাড়া, যাতায়াত আর সন্তানের স্কুলের বেতনে ফুরিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় বেঁচে থাকার এক নির্মম অঙ্ক মেলানোর খেলা। একসময় যে মধ্যবিত্তের ডাইনিং টেবিলে সপ্তাহে দু-তিনদিন মাছ-মাংস থাকত, আজ সেখানে ডিমের দেখাও মেলে হিসাব করে। সন্তানের পাতে এক টুকরো ভালো খাবার তুলে দিতে গিয়ে বাবা-মা নিজেদের প্লেটে শুধু ডাল আর আলুভর্তা টেনে নেন।
শুধু কাঁচাবাজার নয়, মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠেছে বেঁচে থাকার প্রতিটি ধাপে। গ্যাস, বিদ্যুৎ আর পানির বিল প্রতি মাসে যেন একেকটি নতুন আতঙ্কের নাম। ভর্তুকি কমানোর নামে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দফায় দফায় যখন জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, তখন সবচেয়ে বড় কোপটা পড়ে এই সীমিত আয়ের মানুষদের ঘাড়েই।
আইএমএফ-এর ঋণ, রিজার্ভ সংকট বা সামষ্টিক অর্থনীতির বড় বড় তত্ত্ব হয়তো নীতিনির্ধারকদের আলোচনার খোরাক জোগায়, কিন্তু মাস শেষে বিদ্যুৎ বিলের কাগজটা হাতে নিয়ে মধ্যবিত্ত বাবার কপালে যে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে, অর্থনীতির কোনো সূত্রে তার ব্যাখ্যা থাকে না। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রথম যে কাটছাঁট করা হয়, তা হলো সন্তানের পুষ্টি, বিনোদন কিংবা শখের জিনিস। একটি ভালো গল্পের বই কেনা, ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া বা একটু ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়া এগুলো আজ মধ্যবিত্তের কাছে চরম বিলাসিতা। এর পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর লাগামহীন চিকিৎসা ব্যয় আর ওষুধের দামের ঊর্ধ্বগতি যেন মৃত্যুর আগে আরেক মৃত্যুযন্ত্রণা।
কিন্তু কেন এই অবস্থা? কেন বাজারের এই আগুন নিভছে না? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের আবেগের পাশাপাশি চোখ রাখতে হবে বাজারের নিষ্ঠুর বাস্তবতা এবং আইনি কাঠামোর দিকে।
বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা যেন এক অদৃশ্য দানবের হাতে বন্দি, যার পোশাকি নাম ‘সিন্ডিকেট’। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট আমাদের এক নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে ঠিকই, কিন্তু বাজারের অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কোনো পতন হয় না। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এরা কেবল খোলস বদলায়।
আমরা দেখেছি, কীভাবে ডলার সংকট আর এলসি খোলার অজুহাত দেখিয়ে রাতারাতি নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করা হয়। ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা যারা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, তাদের এই অর্থপাচারের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মধ্যবিত্তকে বাড়তি দাম আর লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির কষাঘাতে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে আমাদের আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে। সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য রয়েছে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’। এই আইনের অধীনে নিয়মিত বাজার তদারকি বা জরিমানাও হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাকে কয়েক হাজার টাকা জরিমানা করাটা হাতির গায়ে মশা বসার মতো।
অপরাধীরা জরিমানার টাকাকে ব্যবসার আনুষঙ্গিক খরচ বা ‘অপারেটিং কস্ট’ হিসেবেই ধরে নেয়। এরপর আসা যাক ‘প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২’-এর কথায়। বাজারে যাতে কোনো একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে এই আইন করা হয়েছিল। কিন্তু গুটিকয়েক করপোরেট প্রতিষ্ঠান যখন ভোজ্যতেল বা পোলট্রির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তখন আইনি সংস্থাগুলোর ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই কাগুজে বাঘের মতো মনে হয়।
সবচেয়ে কঠোর আইনটির কথা না বললেই নয় ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪’। এই আইনের ২৫(১) ধারা অনুযায়ী, মজুতদারি বা কালোবাজারির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। অথচ চাল, পেঁয়াজ বা ডিম মজুত করে যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে এই আইনের প্রয়োগ আমরা কয়টি দেখেছি? মাঝেমধ্যে লোকদেখানো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয় ঠিকই, কিন্তু রাঘববোয়ালরা সবসময়ই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইনের প্রয়োগ হয় কেবল বাজারের খুচরা বিক্রেতা বা ক্ষুদ্র আড়তদারের ওপর।
আইনি দুর্বলতার পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারের অভাবও এখানে প্রকট। আমাদের ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’ এবং ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪’ থাকলেও, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের সম্পদের উৎস খুঁজতে বা তাদের আইনের আওতায় আনতে এসব আইনের প্রয়োগ কতটুকু দৃশ্যমান? চাঁদাবাজির যে অদৃশ্য চেইন গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের আড়ত পর্যন্ত বিস্তৃত, তাকে ভাঙতে না পারলে কেবল খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো লাভ হবে না।
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রের উচিত অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন ‘মূল্য কমিশন’ (চৎরপব ঈড়সসরংংরড়হ) গঠন করা। যারা উৎপাদন খরচ, আমদানি ব্যয় এবং যৌক্তিক মুনাফার ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম নির্ধারণ ও কঠোরভাবে তদারকি করবে।
পাশাপাশি, যারা বাজার অস্থিতিশীল করে, তাদের কেবল জরিমানা নয়, বরং ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং ট্রেড লাইসেন্স চিরতরে বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাঁদাবাজি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন’-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
মধ্যবিত্ত হলো একটি দেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী শ্রেণি। তারা যদি বাজারের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তবে সমাজের কাঠামো ধসে পড়তে বাধ্য। ঘামে ভেজা শার্ট আর মলিন মুখের এই মানুষগুলো হয়তো সহজে রাস্তায় নেমে স্লোগান দেয় না, কিন্তু তাদের বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা ক্ষোভ আর হতাশার আগুন যখন ছড়িয়ে পড়বে, তখন কোনো আইন বা সান্ত্বনার বাণী দিয়েই তা নেভানো যাবে না। রাষ্ট্রের উচিত অবিলম্বে এই নীরব শ্রেণিকে বুকে টেনে নেওয়া, তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকু আইনের কঠোর বর্মে সুরক্ষিত করা। বাজারের এই দাবানল নিভুক, মানুষ তার আত্মসম্মান নিয়ে দুবেলা দুমুঠো খেয়ে বাঁচুক আজকের বাংলাদেশে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এটাই সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।
লেখক: কলামিস্ট
কেকে/ এমএস