শুধু সন্দেহের বশে কাউকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে বহিষ্কার করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) মুর্শিদাবাদের এক ব্যক্তির আটকাদেশ ও তাকে ভারত থেকে বহিষ্কারের প্রস্তাব চ্যালেঞ্জ করে করা একটি মামলার শুনানিতে এমন মন্তব্য করেন তিনি। দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া প্রতিবেদন এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
শুনানিতে ওই ব্যক্তির আইনজীবী জানান, কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া সন্দেহের জেরে গত ৮ আগস্ট থেকে তার মক্কেলকে আটক রাখা হয়েছে।
আটক ব্যক্তির স্ত্রী মামলাটি দায়ের করেন। তিনি ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসের (এফআরআরও) জারি করা বহিষ্কারাদেশ এবং স্বামীর আটকাদেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তবে ওই ব্যক্তির স্ত্রীকে আটক করা হয়নি।
শুনানিতে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বহিষ্কারের আদেশ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, আবেদনকারীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে ওই ব্যক্তিকে দুই মাস ধরে আটকে রাখার কারণ এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ে কর্তৃপক্ষ সুস্পষ্ট ও প্রমাণযোগ্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ভুক্তভোগীর আইনজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, তার মক্কেল দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে আটক রয়েছেন। কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া সন্দেহই আটকের মূল কারণ।
শুধু এমন দাবির ভিত্তিতে কীভাবে কারও নাগরিকত্ব নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব, সে প্রশ্নও তোলেন বিচারপতি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে আটক রাখা যায় না।
সত্তরের দশক থেকে কত মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসেছেন এবং তাদের সবাইকে ফেরত পাঠানো সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পরে মামলাটি উপযুক্ত বেঞ্চে ন্যস্ত করার জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যের বিরুদ্ধে বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আদালত বা ট্রাইব্যুনালের আদেশ ছাড়াই সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সহায়তায় তাঁদের বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন সরকার ‘আটক, নাম বাদ দেওয়া ও বহিষ্কার’ নীতি ঘোষণা করে। ওই নীতির আওতায় সন্দেহভাজন বাংলাদেশিদের আটকশিবিরে রেখে দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানোর কথা বলা হয়।
বাংলাদেশে প্রায় এক বছর অবস্থানের পর আদালতের নির্দেশে গত জুলাইয়ে মালদহের মহদীপুর স্থলবন্দর দিয়ে এমন চারজন ভারতীয়কে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, কাউকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা। কেবল কয়েকজনের বক্তব্যের ভিত্তিতে কাউকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
রাজ্য সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট-জেনারেল রাজদীপ মজুমদার ইঙ্গিত দিয়েছেন, আটক ব্যক্তি ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে ভোটার কার্ড, আধার ও প্যান কার্ড সংগ্রহ করে থাকতে পারেন।
নাগরিকত্ব, পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকা নিয়ে ভারতে চলমান বিতর্কের মধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের এ পর্যবেক্ষণ সামনে এসেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া ঘিরেও দেশজুড়ে বিতর্ক চলছে।
বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক প্রকৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের অনেকে সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে বহিষ্কৃত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এসআইআর প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকারও সমালোচনা হচ্ছে। তার পদত্যাগের দাবিতে ভারতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেকে/ এমএস