যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ২০০৯ সালে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত সাবেক সেনা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। পেন্টাগন জানিয়েছে, আগামী ৩ ডিসেম্বর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো মৃত্যুদণ্ড এভাবে সরাসরি সম্প্রচারের ঘটনা নজিরবিহীন হতে যাচ্ছে।
পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য লাইভস্ট্রিম করা হবে। তবে সম্প্রচারের বিস্তারিত পরে জানানো হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি এ তথ্য দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেছেন। হাসানকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, টেক্সাসের ফোর্ট হুড ঘাঁটিতেই স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। ২০০৯ সালের হামলাটিও একই ঘাঁটিতে হয়েছিল। হেগসেথের ভাষ্য, হামলার দিন, সময় ও স্থানকে বিবেচনায় রেখেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০০৯ সালের হামলায় নিহত হন ১৩ জন
নিদাল হাসান যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাবেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। ২০০৯ সালে ফোর্ট হুডের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে লেজার-নির্দেশিত পিস্তল দিয়ে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা করেন তিনি। ওই ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের গুলিতে হাসান আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন এবং পরে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে থাকেন।
২০১৩ সালের আগস্টে সামরিক আদালতের একটি জুরি তাকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যা ও পূর্বপরিকল্পিত হত্যাচেষ্টার ৪৫টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। বর্তমানে তার বয়স ৫৬ বছর।
মার্কিন সামরিক আইনে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য প্রেসিডেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। পেন্টাগন জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের সুপারিশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ অনুমোদন দিয়েছেন। তবে সরাসরি সম্প্রচারের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য না করে প্রশ্নগুলো পেন্টাগনের কাছে পাঠিয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড টেলিভিশনে সম্প্রচারের উদ্যোগ অতীতেও নেওয়া হয়েছিল। তবে আদালতের বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দেশে আইনিভাবে কার্যকর করা মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের নজিরও জানা নেই।
ইয়েল ল স্কুলের সামরিক আইন বিশেষজ্ঞ ইউজিন ফিডেল এ ধরনের সম্প্রচারকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আইনে ফায়ারিং স্কোয়াডের দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও মৃত্যুদণ্ড টেলিভিশন বা অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচারের নজির নেই। তবে হাসান চাইলে এ ধরনের প্রকাশ্য সম্প্রচার বন্ধ করতে ফেডারেল আদালতে মামলা করতে পারেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সামরিক বিচারব্যবস্থার ইতিহাসবিদ জোনাথন লুরিও মৃত্যুদণ্ড প্রকাশ্যে দেখানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট নয়।
মৃত্যুদণ্ডবিরোধী সংগঠন ডেথ পেনাল্টি অ্যাকশন জানিয়েছে, হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে ১৯৬১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটবে। তবে সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ফাঁসিতে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে সর্বশেষ ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালে।
ইনজেকশনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ব্যর্থতার পর বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের মধ্যে হাসানের মৃত্যুদণ্ডের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। গত সপ্তাহে টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কারা কর্মকর্তারা ইনজেকশন প্রয়োগে ভুল করায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পাইকের আইনজীবীরা বুধবার জানিয়েছেন, হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর তিনি ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত ছিলেন। তাঁদের দাবি, পাইক এখনো গুরুতর অসুস্থ এবং হাসপাতালের বিছানায় শিকলবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধান রয়েছে। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাউথ ক্যারোলাইনা ১৫ বছরের বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো এ পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।
ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি গুরুতর ফেডারেল অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদিত পদ্ধতির তালিকায় ফায়ারিং স্কোয়াডের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক চেয়ারে মৃত্যু ও গ্যাস প্রয়োগে শ্বাসরোধের পদ্ধতিও যুক্ত করেছে। প্রাণঘাতী ইনজেকশনের ওষুধ সংগ্রহে ক্রমবর্ধমান জটিলতা এবং এ পদ্ধতি প্রয়োগে বিভিন্ন সমস্যার কারণে বিকল্প পদ্ধতি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ