বাংলা আধুনিক গানে যে কয়েকজন মৌলিক শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার তাদের স্বতন্ত্র কথা এবং গায়কী দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে নীহার লিখন অন্যতম। তার সৃষ্টিশীল গানগুলো শ্রোতাদের মনকে ছুঁয়ে যায় গভীর অনুভূতি আর সরলতায়। সম্প্রতি তার প্রকাশিত মৌলিক গান ‘তাকে আর খুঁজি নাই’ শ্রোতামহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে এবং গানপ্রেমীদের মাঝে দারুণ কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। এই গানে হারানোর বেদনা, আত্মউপলব্ধি এবং এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গানটির পেছনের গল্প, সৃষ্টির নেপথ্য ভাবনা ও সামগ্রিক সঙ্গীতযাত্রা নিয়ে নীহার লিখনের সাথে একান্ত আলাপ।
খোলা কাগজ : শুরুতেই আপনাকে অনেক শুভেচ্ছা, নীহার লিখন। আপনার লেখা, সুর ও কণ্ঠে ‘তাকে আর খুঁজি নাই’ শ্রোতাদের মনে এক অন্যরকম গভীর দাগ কেটেছে। এই গানটির শিরোনাম ও ভাবনার পেছনের গল্পটা যদি একটু বলতেন?
নীহার লিখন : অনেক ধন্যবাদ। আসলে জীবন চলার পথে মানুষ আসে, আবার হারিয়ে যায়। কিছু চলে যাওয়া ক্ষত তৈরি করে, আর কিছু চলে যাওয়া আমাদের নিজেদেরকেই চেনার সুযোগ করে দেয়। ‘তাকে আর খুঁজি নাই’ গানটি ঠিক তেমনই এক আত্ম-উপলব্ধির জায়গা থেকে লেখা। যখন আপনি বুঝতে পারেন যে, পরিব্রাজনই জীবনের মহত্তম দার্শিক সত্যটি, এবং খুঁজতে খুঁজতে একটা সময় নিজের সত্তাকেই হারিয়ে ফেলার চেয়ে না খোঁজার স্বাধীনতা অনেক বেশি শান্তির—তখনই এই গানটির জন্ম। এটি মূলত কোনো অভিযোগ নয়, বরং এক ধরনের মানসিক মুক্তি ও আত্মসন্ধানের গল্প।
খোলা কাগজ : গানটির কথা তো বটেই, এর সুর এবং গায়কীও বেশ আকর্ষক। গানটি তৈরির প্রক্রিয়াটি কেমন ছিল?
নীহার লিখন: গান লেখার সময় আমি সবসময় চেষ্টা করি, কথাগুলোর নিজস্ব একটা সুর বা আবহ যেন ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে। এই গানটির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সুরের কাঠামো এমনভাবে রাখা হয়েছে যাতে শ্রোতারা শুধু গান শুনবেন না, বরং কথাগুলোর ভেতরে ডুবে যাওয়ার সুযোগ পান। এর মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং কম্পোজিশন নিয়ে আমরা বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করেছি, যাতে মূল বার্তা এবং ইমোশনটা নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে।
খোলা কাগজ : আপনার গানে নিজস্ব একটা স্বকীয়তা ও স্বরলিপি লক্ষ্য করা যায়। একজন স্বাধীন শিল্পী হিসেবে বাংলা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
নীহার লিখন : স্বাধীনভাবে কাজ করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নিজের মনের কথাটি কোনো রকম আপস ছাড়া শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। আমাদের দেশে এখন অনেক প্রতিভাবান স্বাধীন শিল্পী ও মিউজিশিয়ান কাজ করছেন। শ্রোতারাও এখন নতুন এবং মৌলিক বিষয়ের গান খুব ভালোভাবে গ্রহণ করছেন। এই ইতিবাচক পরিবর্তনটা আমাকে সবসময় নতুন গান তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করে।
খোলা কাগজ : এমন চিন্তার ক্ষেত্রে কবি, কথাশিল্পী নীহার লিখন কি প্রভাব রাখেন গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠ শিল্পী নীহার লিখনের উপর? (হা হা হা)
নীহার লিখন : না রাখার কি কোনো কারণ থাকতে পারে (হাসতে হাসতে) বা না থাকা কি উচিৎ?
খোলা কাগজ : কবীর সুমন (সুমন চট্টোপাধ্যায়), অঞ্জনদের মতোই আপনার গানেও একধরনের নাগরিক সাহিত্যবোধের কাব্যিক দর্শনের সঙ্গীতরূপ শ্রোতাকুলে প্রায়শই বলতে শোনা যায়, এ বিষয়টি নিশ্চই উপভোগ করেন?
নীহার লিখন : আসলে সত্যি বলতে আমি চেয়েছি আমার গানটিই করতে বা আমার দায়িত্ব নিতে। যেটা আমি ছাড়া আর কেউ নেবে না, আমার অনুভবের প্রতি আমি যতোটা আবেগী হবো নিশ্চই অন্য কেউ ততোটা হবে না এবং এটাই স্বাভাবিক। আর যে মহারথীদের নাম বললেন একজন সুমন বা অঞ্জন, আমি তাদের যারপরনাই ভক্ত হিসেবে শুনি এবং সৃষ্টির সময় আপন মগ্নতাতেই যতোটা সম্ভব বেশী নিবিষ্ট থাকতে চাই।
খোলা কাগজ : আপনার শ্রোতা ও ভক্তদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন কি?
নীহার লিখন : যারা ‘তাকে আর খুঁজি নাই গানটি শুনেছেন এবং ভালোবেসেছেন, তাছাড়াও আমার অপরাপর গান শোনেন তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা। আর বিশেষ করে ‘তাকে আর খুঁজি নাই’ নিয়ে বলতে গেলে বলবো গানটি আপনাদের নিজেদের জীবনের সাথে মিলে গেলে বা আপনাদের মনের একটু হলেও কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলে আমার প্রচেষ্টা সার্থক বলে মনে করব। আপনারা এভাবেই পাশে থাকুন, সামনে আরও নতুন কিছু গান ও কাজ নিয়ে আপনাদের সামনে আসার পরিকল্পনা আছে।
খোলা কাগজ : আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য এবং চমৎকার এই আলাপচারিতার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার আগামী দিনগুলোর জন্য রইল শুভকামনা।
নীহার লিখন : আপনাকে এবং আপনাদের পুরো টিমকেও অনেক ধন্যবাদ।
কেকে/এমএ