মধ্য আমেরিকার দেশ পানামার দক্ষিণাঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আতঙ্কে হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি ও অফিস ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, শুক্রবার (৯ অক্চোবর) আঘাত হানা ভূমিকম্পটির উৎপত্তি ভূপৃষ্ঠের ১২ দশমিক ৬ কিলোমিটার গভীরে। এর কেন্দ্র ছিল রাজধানী পানামা সিটি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে একটি কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। তবে ভূমিকম্পে হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ভূমিকম্পের পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় দেশটিতে ৪০টিরও বেশি পরাঘাত অনুভূত হয়। এর মধ্যেও পানামা খাল ও পানামা তামার খনির কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর টোকুমেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হয়।
ভূমিকম্পে রাজধানী পানামা সিটির বাণিজ্যিক এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার জন্য ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন হাজারো মানুষ। এতে সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং অফিসফেরত কর্মীরা বাড়ি ফেরার যানবাহন পাওয়া নিয়ে উদ্বেগে পড়েন।
দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের ৩৭ বছর বয়সী কর্মী হুয়ান সানচেজ বাসের অপেক্ষায় থেকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, বাস আসবে কি না, তা নিয়েই তার সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, ভবনগুলো থেকে সবাইকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন বড় সমস্যা হলো, কীভাবে বাড়ি ফিরবেন তারা।
ভূমিকম্পের পর প্রেসিডেন্ট রাউল মুলিনো পেনোনোমে শহর পরিদর্শনে যান। ভূমিকম্পের কেন্দ্র ও রাজধানীর মাঝামাঝি অবস্থিত শহরটিতে কয়েকটি ভবন ধসে পড়েছে এবং একটি গির্জা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৪০ সেকেন্ড স্থায়ী কম্পন
পানামার ভূবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক নেস্তর লুকে ভূমিকম্পটির জন্য আজুয়েরো-সোনা ফল্ট সিস্টেমকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, ওই ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে বিপুল চাপ জমা হয়, যা নির্দিষ্ট সময় পরপর মুক্ত হওয়ার কারণে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
লুকে জানান, ভূমিকম্পের কম্পন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়েছে। রাজধানী পানামা সিটিতে তিনি প্রায় ৪০ সেকেন্ড ধরে কম্পন অনুভব করেন। তবে অন্য এলাকায় কম্পনের স্থায়িত্ব আরও বেশি হতে পারে।
রাজধানীর একটি পুরোনো ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকা সাবিনা রিওস বলেন, কয়েক বছরের মধ্যে এত শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকম্প তিনি অনুভব করেননি।
অন্যদিকে, ৪৮ বছর বয়সী রক্ষণাবেক্ষণকর্মী ভিক্টর পিনজন উঁচু ভবনের বাইরের অংশে কাজ করা জানালা পরিষ্কারকর্মীদের ভূমিকম্পের সময় দুলতে দেখেন। তাঁদের প্রাণে বেঁচে যাওয়াকে অলৌকিক ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মীদের দেখে মনে হচ্ছিল, তাঁরা যেন দোলনায় দুলছেন।
পানামায় শক্তিশালী ভূমিকম্প তুলনামূলক বিরল। তাই অনেক বয়স্ক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় আশ্রয় নেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় হেরেরা প্রদেশের ৭৪ বছর বয়সী রিকার্ডো ব্রাউন জানান, তাদের বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। বাড়িটি ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় তারা ভীত।
দেশটির নাগরিক সুরক্ষা সংস্থার প্রধান ওমর স্মিথ জানান, হেরেরা প্রদেশের রাজধানী চিত্রে এবং লস সান্তোস প্রদেশের উপকূলীয় এলাকাতেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
জিডিপির ১০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা
ইউএসজিএসের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে পানামার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ থেকে ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাতুরজি জানিয়েছে, ছয়টি প্রদেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে।
সংস্থাটির ঝুঁকি মূল্যায়ন অনুযায়ী, পানামার প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে ভূমিকম্পের প্রভাব গুরুতর হতে পারে। তুলনামূলকভাবে, গত জুনে ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি ভূমিকম্পের প্রভাবাধীন এলাকায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষ এবং আগস্টে কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্পকবলিত এলাকায় ১৬ লাখের বেশি মানুষ ছিলেন।
ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলেও পানামায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মৃত্যু বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে, জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার ও সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করতে আগামী সোমবার দেশব্যাপী উচ্ছেদ মহড়া আয়োজনের কথা রয়েছে পানামার। ভূমিকম্পের পর দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশটির প্রস্তুতি যাচাইয়ে এ মহড়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ