মোবাইল ও ডিজিটাল পর্দার কৃত্রিম আলো, সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষণিকের মোহ আর মুঠোফোনের বন্দিদশা ভেঙে এক নতুন আলোর দিশা দেখালো মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। ‘বই পড়ি, মন গড়ি’— দৃপ্ত স্লোগানকে বুকে ধারণ করে শ্রীমঙ্গলে সমাপ্ত হলো এক ঐতিহাসিক পাঠ-আন্দোলন। গত ২১ জুলাই যে স্বপ্নবীজ রোপণ করা হয়েছিল এক স্বর্ণালী দুপুরে তা পূর্ণাঙ্গ এক বৃক্ষে রূপ নিয়ে ছড়িয়ে দিল নতুন এক প্রত্যাশার সুবাস।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে দীর্ঘ পাঠযাত্রা শেষে শ্রীমঙ্গল শহরের জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে আয়োজিত হয় বইপড়া উৎসব ২০২৬-’র ফলাফল প্রকাশ ও পুরস্কার বিতরণ।
উপজেলা প্রশাসনের ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগে উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ বইপ্রেমী এক সুতোয় গাঁথা পড়েছিলেন। শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে মোবাইল স্ক্রিনের আসক্তি মুক্ত করে বইয়ের মননশীল জগতে ফিরিয়ে আনার এ যেন এক নীরব অথচ সুদূরপ্রসারী বিপ্লব।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে স্বপ্নের পুরস্কার তুলে দেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
প্রতিটি শ্রেণির সেরা ১০ জন এবং উন্মুক্ত বিভাগের সেরা পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ল্যাপটপ, বিশেষ শুভেচ্ছা উপহার, স্মারক ক্রেস্ট, বিশ্বমানের বই ও সনদপত্র। এর মধ্যে সেরা আট পাঠকের হাতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আটটি ল্যাপটপ উপহার দেন মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
এ ছাড়া ‘ফল’ (চূড়ান্ত) পর্বের সব প্রতিযোগীর হাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বই উপহার দেন অনুষ্ঠানের সভাপতি মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুজ্জামান পাভেল।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের ভারপপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান।
আবৃত্তিশিল্পী দেবাশীষ দাসের সঞ্চালনা অনুষ্ঠানে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। এ আয়োজনে সমন্বয় সহেযাগী হিসেবে কাজ করে ‘শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব’ এবং পাঠ সহেযাগী হিসেবে ছিল ‘উত্তরণ পাঠাগার’।
উৎসেব চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ৭০ জন বিজয়ীর মধ্য থেকে আটজনেক ‘বেস্ট রিডার’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাদের হাতে সনদ, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
ফোনে আসক্তি কমিয়ে বই থেকে জ্ঞান অর্জন
উৎসবে ল্যাপটপ পাওয়া দি বার্ডস রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজশ্রী হালদার রাজন্যা জানায়, ল্যাপটপ পেয়ে সে আনন্দিত। তবে তার কাছে আরও বড় প্রাপ্তি হলো বই পড়ে নতুন জ্ঞান অর্জন।
রাজন্যার ভাষায়, তিনটি পর্বে নির্ধারিত বইগুলো পড়ে তাদের জ্ঞানের পরিধি বেড়েছে। আগে ফোনে অনেক সময় কাটলেও এখন বই পড়ার মধ্য দিয়ে নতুন বিষয় জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ‘রবিনসন ক্রুসো’র মতো বই তাকে নতুন অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করেছে।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও উত্তরণ পাঠাগারের কর্ণধার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পাঠাগারগুলোতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপস্থিতি বেড়েছে।’ তার মতে, শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে বইয়ের স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি।
শিক্ষাই সবেচয়ে বড় বিনিয়োগ
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘শিক্ষা হচ্ছে আমাদের সবেচয়ে বড় বিনিয়োগ। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়েত হলে তরুণ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আমাদের এ প্রয়াস। একটি-দুটি বই রাতারাতি সমাজ বদলে দিতে পারে না। তবে বই পড়ার অভ্যাস, অজানাকে জানার আগ্রহ এবং শিক্ষার্থীদের কৌতূহল তৈরি হলে তারা একসময় মেধা ও মনেন সমৃদ্ধ হবে। দেশ গঠনেও ভূমিকা রাখতে পারবে।’
ইউএনওর দাবি, উৎসবকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বইপড়া, প্রশ্ন করা এবং নিজেদের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাগারচর্চা স্থিমিত হয়ে পড়েছিল, সেগুলোও নতুন করে সচল হচ্ছে। শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহেযাগিতায় এ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জ্ঞানচর্চার স্থায়ী অভ্যাস গড়ে তোলা
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য কেবল প্রতিযোগিতা নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঝিমিয়ে পড়া লাইব্রেরিগুলোকে আবার সচল করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিংমিত জ্ঞানচর্চার স্থায়ী অভ্যাস গড়ে তোলা।
যন্ত্রপাতির নির্ভরতা কমিয়ে বইমুখী হোক মানুষ
সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী জানান, উৎসবে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি মানুষের বইপড়ার আগ্রহ দেখে তিনি আনন্দিত। দেশের অন্যান্য উপজেলাতেও এমন উদ্যোগ ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তার ভাষ্য, মানুষ যেন প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়। বইপড়ার অভ্যাস বাড়লে মাদকাসক্তি ও শিশু-কিশোরদের গ্যাং-সংস্কৃতির মতো সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হতে পারে। এ উদ্যোগে উৎসাহ দিতে ব্যক্তিগতভাবে আটটি ল্যাপটপ উপহার দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
উৎসব শেষ, পরীক্ষা এখন অভ্যাস ধরে রাখার
আয়োজকদের কাছে এ আয়োজনের লক্ষ্য কেবল প্রতিযোগিতা, সনদ কিংবা ল্যাপটপ বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠাগার সচল রাখা এবং বইয়ের মাধ্যমে চিন্তা ও মননশীলতার বিকাশ ঘটানোই এর মূল উদ্দেশ্য। তবে ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে আয়োজনের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে উৎসব শেষ হওয়ার পর। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বই পড়েছ কি না, পাঠাগারগুলো সচল থাকছে কি না এবং বই পড়ার আগ্রহ দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে কি না– সেই পরীক্ষাই এখন বড়।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে শ্রীমঙ্গলের তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিনের উদ্যোগে বইপড়া উৎসবের সূচনা হয়। ধারাবাহিক সেই আয়োজনের দ্বিতীয় বছের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ শ্রীমঙ্গলে পাঠচর্চা বিস্তারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
‘মুকুল’ থেকে ‘ফুল’ হয়ে ‘ফল’ রূপের বিস্ময়কর সফর
আয়োজক কমিটি জানায়, গত ১৭ আগস্ট ‘মুকুল’, ‘ফুল’ ও ‘ফল’—তিন ধাপে শুরু হয় এ পাঠ উৎসব। প্রথম পর্বে ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে থেকে বাছাইকৃত ১ হাজার ৯৫৭ জন দ্বিতীয় পর্বে এবং চূড়ান্ত পর্বে ৭৪০ জন প্রতিযোগী অংশ নেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজররুল ইসলাম, সৈয়দ মুজতবা আলী, জর্জ অরওয়েল, এপিজে আবদুল কালাম থেকে শুরু করে ‘রবিনসন ক্রুসো’ ও ‘দ্য আলকেমিস্ট-’র মতো বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ছিল শিক্ষার্থীদের পাঠতালিকায়। চূড়ান্ত পর্বে নির্বাচিত ৭০ জন বিজয়ীর মধ্য থেকে সেরা ৮ জন পাঠকেক ‘বেস্ট রিডার’ সম্মাননা হিসেবে সনদ, ল্যাপটপ ও বই উপহার দেওয়া হয়। এ ছাড়া উন্মুক্ত ক্যাটাগরিতে শিক্ষক, চিকিৎসক ও বিভিন্ন পেশার দেড় শতাধিক বইপ্রেমী অংশ নেন।
পাঠস্পৃহা জাগিয়ে তুলতে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটে গেছেন ইউএনও
শুধু একটি আয়োজন ঘোষণা করেই হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি উপজেলা প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে বইয়ের আলো পৌঁছাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমানসহ জেলা প্রশাসক এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যও সরেজমিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কথা বলেছেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে, জাগিয়ে তুলেছেন পাঠস্পৃহা।
আয়োজক কমিটি জানায়, গত ১৭ আগস্ট প্রথম পর্ব ‘মুকুল’-এ ২৫ হাজার শিক্ষার্থী একযোগে বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী সব বই নিয়ে পাঠযাত্রায় অংশ নেয়। এতে স্থান পায় আবদুল্লাহ আল-মুতী, এপিজে আবদুল কালাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজররুল ইসলাম, সৈয়দ মুজতবা আলী, জহির রায়হান, হুমায়ুন আজাদ ও জর্জ অরওয়েলের কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা রক্ষায় এক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা ও মূল্যায়ন করা হয়।
গত ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় পর্ব ‘ফুল’ অনুষ্ঠিত হয়। মুকুল পর্ব পেরিয়ে ১ হাজার ৯৫৭ জন সুযোগ পায় দ্বিতীয় পর্বে। যেখানে আল মাহমুদ, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, অ্যান ফ্রাঙ্ক, জগদীশ চন্দ্র বসু, তারাশঙ্কর ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দিকপালদের বইয়ের সাগরে ডুব দেয় শিক্ষার্থীরা।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত পর্ব ‘ফল’ অনুষ্ঠিত হয়। কড়া মূল্যায়নের পর ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয় মিলনায়তেন আয়োজিত চূড়ান্ত ‘ফল’ পর্বে অংশ নেয় উন্মুক্ত বিভাগসহ ৭৪০ জন বইপ্রেমী। যেখানে পাঠ্য তালিকা হিসেবে ছিল ‘রবিনসন ক্রুসো’, ‘ইকিগাই’', ‘দ্য আলকেমিস্ট’, ‘পথের পাঁচাল’ কিংবা ‘বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনীর মতো বই।
বয়সের সীমান্ত পেরিয়ে ‘উন্মুক্ত বিভাগ
উৎসবকে সব বয়েসর মানুষের জন্য সর্বজনীন রূপ দিতে যুক্ত করা হয়েছিল ‘উন্মুক্ত বিভাগ’। শিক্ষক, চিকিৎসক, চাকুরিজীবীসহ নানা পেশার দেড় শতাধিক বইপ্রেমী এতে নিবন্ধিত হন। কাজী নজরুল ইসলামের ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, রবীন্দ্রনাাথের ‘গোরা’ কিংবা জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এর পাতায় পাতায় ডুব দিয়ে প্রবীণরাও যেন ফিরে পেয়েছিলেন নবীন প্রাণশিক্ত।
পুরস্কারের চেয়ে বড় পাঠাভ্যাস
আয়োজকদের মতে, উৎসবের মূল সাফল্য শুধু বিজয়ীদের পুরস্কারপ্রাপ্তিতে নয়; বরং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলার মধ্যে। পাঠাগারকে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা, পর্দানির্ভর বিনোদনের বাইরে জ্ঞানের জগৎ উন্মুক্ত করা এবং প্রশ্ন করেত শেখানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার স্থায়ী অভ্যাস গড়ে উঠবে এবং সচল হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিস্তেজ হয়ে পড়া পাঠাগারগুলোও।
এবারের বইপড়া উৎসবে ব্যাপকসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও কলামিস্টরা। এই পাঠ-আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে উৎসবের পরও শিক্ষার্থীরা কতটা নিয়মিত বই পড়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কতটা পাঠবান্ধব পরিবেশ ধরে রাখতে পারছে, তার ওপর।
কেকে/এআই