মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● তারেক রহমানকে ঘিরে রাজশাহীতে উৎসবের আমেজ, উন্নয়ন নিয়ে যত প্রত্যাশা      ● ডেঙ্গু কেড়ে নিল আরও চার প্রাণ      ● সরকারি চাকরিজীবীদের এ মাসেই বাড়তি বেতন, প্রজ্ঞাপন জারি      ● প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন      ● আগামী ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু      ● ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী       ● গণবিক্ষোভে অস্থির ফ্রান্স, গ্রেপ্তার ২৪০০—ম্যাক্রোঁর কঠোর বার্তা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
শান্তির নোবেলে অশান্তির রাজনীতি
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৭ এএম

আলফ্রেড নোবেলের উইলের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বজুড়ে ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি, যুদ্ধ হ্রাস এবং শান্তি স্থাপন করা। মানবকল্যাণের এই সর্বোচ্চ মঞ্চটি আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। যে লক্ষ্য নিয়ে ডিনামাইটের আবিষ্কারক এই অনন্য পুরস্কারের প্রবর্তন করেছিলেন, তা আজ বিশ্ব রাজনীতির দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রতি বছর পুরস্কারের মরশুম এলেই মানুষের মনে এক ধরনের সংশয় ও ভীতির উদ্রেক ঘটে।

শান্তির এ সুউচ্চ মহৎ উদ্দেশ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে ইতিহাসজুড়ে বহু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সংঘটিত হতে দেখা গেছে। কালের পরিক্রমায় এই মহৎ উদ্দেশ্য বহুবার হোঁচট খেয়েছে। শান্তিদূতের মুখোশের আড়ালে থাকা বহু যুদ্ধবাজ ও সাম্রাজ্যবাদী দালালকে এই পদকে ভূষিত করা হয়েছে। এই আতঙ্কের পালে হাওয়া দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জোরালো দাবি। 

২০২৬ সালের পুরস্কারের জন্য ট্রাম্প নিজেকে যোগ্য দাবি করায় বিশ্বব্যাপী তীব্র ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। যিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় রেখেছেন এবং একের পর এক দেশে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছেন, তার মতো আগ্রাসী নেতার নোবেল প্রাপ্তির সম্ভাবনা শান্তির ধারণাকেই এক চরম তামাশায় পরিণত করেছে। যদিও ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনবিদ ও মানবাধিকারকর্মী নাভি পিল্লাই মিয়ানমার থেকে ভেনিজুয়েলা হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত শান্তি নামক সোনার হরিণ আজ ভূলুণ্ঠিত হয়েছে তথাকথিত কিছু শান্তি বিজয়ীদের এজেন্ডার কারণে। 

বিশ্বজুড়ে এমন অন্তত ১৬ জন বিতর্কিত নোবেল জয়ী আছেন, যাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এবং সাম্রাজ্যবাদের দালালি আজ বিভিন্ন স্বাধীন দেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত করেছে। 

ভেনিজুয়েলার তথাকথিত গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রবক্তার কর্মকাণ্ডও আজ লাতিন আমেরিকার শান্তি ও অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ছেড়েছে। ভেনেজুয়েলার বর্তমান রাজনৈতিক  বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর কর্মকাণ্ড দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিদেশি শক্তির মদদে নিজের দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে দালালির ভূমিকা পালন করছেন। এমন বিতর্কিত ব্যক্তিদের শান্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরায় পুরস্কারের মর্যাদা আজ ভূলুণ্ঠিত।

ইতিহাসের পাতায় হেনরি কিসিঞ্জার এবং আনোয়ার সাদাতের মতো বিতর্কিত নোবেলজয়ীদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এখনো মানুষের মনে দগদগে ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। কিসিঞ্জারের কূটনীতি লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল, তবুও তিনি শান্তির মেডেল গলায় পরেছিলেন। অন্যদিকে বারাক ওবামার নোবেল পাওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন হামলার মহোৎসব শুরু হয়েছিল। শান্তির বুলি আওড়ে তারা কেবল নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও যুদ্ধকেই দীর্ঘস্থায়ী করেছিলেন। 

ইথিওপিয়ার আবি আহমেদ শান্তিতে নোবেল পাওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় নিজ দেশের তিগ্রে অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু করেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার মেডেল নিয়ে তিনি মেতে উঠেছিলেন নির্মম নরসংহার আর ধ্বংসযজ্ঞের নিষ্ঠুর খেলায়। একইভাবে ইসরায়েলের শিমোন পেরেজ কিংবা ইয়াসির আরাফাত কেউই মধ্যপ্রাচ্যের বুকে স্থায়ী শান্তি এনে দিতে পারেননি। তাদের নোবেল প্রাপ্তি যেন রক্তের ওপর শান্তির এক নির্মম পরিহাস মাত্র ছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বিশ্বকে একক পরাশক্তির হাতে তুলে দেওয়া মিখাইল গর্বাচেভও এই শান্তি মেডেল পেয়েছিলেন। তার নেওয়া ত্রুটিপূর্ণ নীতির কারণে লাখ লাখ মানুষ চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখে পড়েছিল। শান্তিতে নোবেলপ্রাপ্ত লিউ জিয়াওবো কিংবা দলাই লামার রাজনৈতিক অবস্থানও তিব্বত ও এশীয় অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করতেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছিল।

ইউরোপীয় ইউনিয়নকে যৌথভাবে নোবেল দেওয়া হলেও তাদের অস্ত্র ব্যবসা এবং আফ্রিকার সম্পদ লুণ্ঠনের নীতি শান্তিকামী মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। নোবেল মেডেলটি আজ যেন কেবল পশ্চিমা বিশ্বের আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের আড়াল করার সুদৃশ্য হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে এই পদকধারীরা বারবার সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ ও যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখতে ভূমিকা রেখেছেন। 

কলম্বিয়ার হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস কিংবা কোফি আনানের মতো ব্যক্তিত্বরা শান্তির জন্য প্রশংসিত হলেও তাদের কর্মক্ষেত্রের বাস্তব ফলাফল ছিল ভয়াবহ ব্যর্থতায় ভরা। বিশ্বজুড়ে যেখানেই শান্তির নোবেল গিয়েছে, সেখানেই পরবর্তী সময়ে বড় কোনো মানবিক বিপর্যয় কিংবা গৃহযুদ্ধের কালো ছায়া গ্রাস করেছে। বর্তমানে এই পুরস্কারের বিশ্বস্ততা এতটাই নিচে নেমে গেছে যে সাধারণ মানুষ একে সাম্রাজ্যবাদের বড় দালালদের সার্টিফিকেট হিসেবে গণ্য করেন। 

শান্তি ফেরানোর নামে লিবিয়া, সিরিয়া ও ইরাককে যেভাবে শ্মশানে পরিণত করা হয়েছে, তার পেছনেও কোনো না কোনো নোবেলজয়ীর পরোক্ষ সম্মতি জড়িয়ে ছিল। এ সময়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের নিকট এক পরম আতঙ্কের নাম নোবেলপ্রাপ্ত ডক্টর ইউনুস ও তার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নেতিবাচক কর্মকাণ্ড। গ্রামীণ ব্যাংকের চড়া ও চক্রবৃদ্ধি সুদের যাঁতাকলে পড়ে দেশের লাখো গরিব ও দুঃখী মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসেছেন। কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে অনেক অসহায় মানুষ শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

তার দূরদর্শিতাহীন জেদ ও ভুলের কারণে দেশের স্বাস্থ্যখাতে চরম বিপর্যয় নেমে আসে, যার ফলশ্রুতিতে হামে হাজারো নিষ্পাপ শিশুর অকাল মৃত্যু ঘটে। নিজের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার হীন উদ্দেশ্যে তিনি রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থবিরোধী নানা বিতর্কিত ও গোপন চুক্তিতে লিপ্ত হন।

আইন লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। নিজের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে তিনি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে মব উসকে দিয়ে চরম অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। তার নেওয়া নীতিহীন ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপগুলো দেশের টানা চারটা জেনারেশনের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়ে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

দেশপ্রেমের লেবাস পরে তিনি দেশের আপামর মানুষের মধ্যে তীব্র বিভাজন ও পারস্পরিক ঘৃণার এক স্থায়ী দেয়াল সৃষ্টি করেছেন। ট্রাভেল এজেন্সী ও বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত আইন ও অনুমোদন নীতিমালা কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি সবকিছু নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। গ্রামীণ জনগণের রক্ত চোষা অর্থ দিয়ে তিনি বিদেশে ক্লিংটন ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংস্থাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করেছেন।

শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও লভ্যাংশ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। নিজের অপরাধ ঢাকতে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লবিং করে দেশের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা জারির হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। দেশের জ্বালানি, যোগাযোগ ও শিক্ষাখাতকে তিনি নিজের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র বানিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে এক চরম দুর্বিষহ নরকে পরিণত করেছিলেন।

তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে আজ গ্রামীণ জনপদে হাজারো পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব ও যাযাবর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। শান্তিদূত সেজে তিনি দেশের ভেতরের শান্তি ও সম্প্রীতিকে চিরতরে বিনষ্ট করার এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী ব্লুপ্রিন্ট বাস্তবায়ন করেছেন। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে তাই এই ডক্টরের নাম আজ এক চরম আতঙ্ক, ঘৃণা ও তীব্র ক্ষোভের প্রতিশব্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
 
লেখক : প্রাবন্ধিক

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close