বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বিজয়া দশমী আজ, মণ্ডপে মণ্ডপে বিদায়ের সুর      ● চট্টগ্রামের জেএম সেন হল পূজামণ্ডপ পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর      ● এ বছর ৪০ লাখ কৃষক পাবেন কৃষি কার্ড : প্রধানমন্ত্রী      ● রাজশাহীতে ৩৮৯৭০ আখচাষিকে ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী      ● হামে শিশু মৃত্যু ১২০০ ছাড়াল      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৩৬৬      ● ২৬-২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার প্রত্যাশা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
প্রবাসীর মৃত্যু, রাষ্ট্রের দায় ও নাগরিকত্বের নৈতিকতা
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২১ পিএম আপডেট: ২১.১০.২০২৬ ১২:২৩ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

একজন মানুষ বিদেশে পাড়ি জমান শুধু চাকরি বা উন্নত জীবনের সন্ধানে নয়। সঙ্গে নিয়ে যান পরিবারের স্বপ্ন, ঋণের বোঝা, প্রিয়জনদের প্রত্যাশা এবং নিজের দেশের প্রতি এক নীরব আস্থা। তার বিশ্বাস থাকে, বিদেশের মাটিতে যত প্রতিকূলতাই আসুক, পেছনে একটি রাষ্ট্র আছে, একটি পতাকা আছে, একটি দূতাবাস আছে এবং আছে স্বদেশে ফেরার অধিকার। এই আস্থাই তাকে পরিবার ছেড়ে হাজার মাইল দূরে কাজ করার মানসিক শক্তি দেয়।

কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে যদি প্রশ্ন ওঠে—তার মরদেহ দেশে ফিরবে কি না, তিনি মৃত্যুর পরও স্বদেশের গ্রহণযোগ্য নাগরিক কি না, কিংবা অপরাধের অভিযোগের কারণে তার দেহ স্বদেশে আসা উচিত কি না— তখন বিষয়টি আর কোনো একক পরিবারের শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন কাঠগড়ায় দাঁড়ায় রাষ্ট্রের চরিত্র, সমাজের নৈতিকতা এবং নাগরিকত্বের ধারণা।

রেমিট্যান্সের গৌরব, দায়ের সংকট

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি তাদের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত অর্থ দেশে পাঠান। সেই অর্থে চলে পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা। অনেক পরিবারের কাছে প্রবাসী সদস্যের পাঠানো অর্থই দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের প্রধান অবলম্বন। তাই তাদের আমরা বলি ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’, বিমানবন্দরে সম্মান জানাই এবং অবদান নিয়ে বক্তৃতা দিই।

কিন্তু এই অর্থের পেছনের শ্রম, ঝুঁকি, বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক যন্ত্রণা জাতীয় আলোচনায় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। একজন শ্রমিক বিদেশযাত্রার জন্য জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন, সুদের বোঝা কাঁধে নেন। অনেক সময় দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হন। বিদেশে পৌঁছে প্রত্যাশিত কাজ পান না, চুক্তি অনুযায়ী বেতন পান না, কিংবা এমন পরিস্থিতিতে পড়েন, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ তার জানা থাকে না। নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ হলে চাকরি হারানোর পাশাপাশি আবাসন, বৈধ অবস্থান ও দেশে ফেরার সক্ষমতাও ঝুঁকিতে পড়ে।

দেশে ফিরে তার পাঠানো অর্থকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প তৈরি হয়; তার নামে ব্যাংকিং সেবা, প্রণোদনা ও সম্মাননার প্রচার চলে। এসব উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক অবদানের স্বীকৃতির পাশাপাশি তার মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়টি কি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে?

একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু নাগরিকের উপার্জিত অর্থকে বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিয়ে আসা নয়। সেই অর্থ উপার্জনের পথে নাগরিক যেন শোষণ, নির্যাতন, প্রতারণা বা অবহেলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও রাষ্ট্রের দায়। প্রবাসীর অর্থ অর্থনীতি সমৃদ্ধ করবে, অথচ তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে রাষ্ট্র নীরব থাকবে—এমন অসম সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ধর্মীয় শ্রদ্ধা ও রাষ্ট্রের জবাবদিহি

সৌদি আরব বাংলাদেশের মানুষের কাছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দেশ। পবিত্র মক্কা ও মদিনার কারণে দেশটির প্রতি আমাদের আবেগ ও শ্রদ্ধা গভীর। হজ-ওমরাহ, দীর্ঘদিনের শ্রমবাজার এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক যোগাযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে।

কিন্তু ধর্মীয় শ্রদ্ধা আর একটি রাষ্ট্রের শ্রমনীতি, বিচারব্যবস্থা বা মানবাধিকার পরিস্থিতির সমালোচনামূলক মূল্যায়ন—এ দুটি ভিন্ন বিষয়। কোনো দেশের ধর্মীয় গুরুত্ব তার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তুলে দিতে পারে না। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা মানে এই নয় যে, সেখানে কর্মরত নিজেদের নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে আমরা নীরব থাকব।
পরিণত কূটনীতি রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নাগরিকের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে।

যেখানে সহযোগিতা প্রয়োজন, সেখানে সহযোগিতা করবে; আবার নাগরিকের অধিকার বিপন্ন হলে তথ্য চাইবে, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করবে এবং প্রয়োজনে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানাবে। সম্পর্কের গভীরতা তখনই অর্থবহ, যখন তার সুফল শুধু রাষ্ট্র বা অর্থনীতির স্তরে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রতিফলিত হয়।

শ্রমিকের স্বাধীনতা কতখানি?

সৌদি আরবে অভিবাসী শ্রমিকদের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। বিশেষ করে গৃহকর্মী, নারী শ্রমিক এবং নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীল কর্মীদের ক্ষেত্রে শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ কয়েকটি সংস্থা অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, বেতন আটকে রাখা, চলাচলে বিধিনিষেধ, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং জবরদস্তিমূলক শ্রমের অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে।

একজন শ্রমিক কেবল মজুরি পেলেই স্বাধীন হন না। তার কাজের পরিবেশ, কর্মঘণ্টার ওপর নিয়ন্ত্রণ, বেতন দাবির সক্ষমতা, নির্যাতনের অভিযোগ করার সুযোগ, নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের সুযোগ এবং নিরাপদে দেশে ফেরার পথ—সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। যখন শ্রমিকের বাসস্থান, আয়, চলাচল ও আইনি অবস্থান কার্যত অন্যের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যায়।

তবে সৌদি আরবে কর্মরত সব শ্রমিকের অভিজ্ঞতা এক নয়, সব নিয়োগকর্তাও এক নন। দেশটিতে শ্রম সংস্কার ও সুরক্ষামূলক বিধান প্রবর্তনের উদ্যোগও রয়েছে। কিন্তু আইনে অধিকার স্বীকৃত থাকা আর বাস্তবে সেই অধিকার কার্যকরভাবে ভোগ করা এক বিষয় নয়। অভিযোগ উঠলে শ্রমিক কত সহজে প্রতিকার পান, অভিযোগের কারণে চাকরি, বাসস্থান বা বৈধ অবস্থান হারানোর আশঙ্কা থাকে কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শ্রমবাজারের সাফল্যকে পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না।

সব অভিবাসী শ্রমিককে দাস বলা তথ্যগতভাবে ভুল। তেমনি জবরদস্তিমূলক শ্রম, স্বাধীনতা হরণ ও শোষণের বাস্তবতাকে কেবল ‘চাকরির সমস্যা’ বলে পাশ কাটানোও অন্যায়। মজুরি প্রদানের পাশাপাশি দেখতে হবে, একজন মানুষ নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কতখানি স্বাধীনতা পাচ্ছেন।

মৃত্যুর সংখ্যা ও অনুত্তরিত প্রশ্ন

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের মৃত্যুর খবর আমাদের কাছে নতুন নয়। দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি, আত্মহত্যা কিংবা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে অস্পষ্টতা—বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা মারা যান। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত জীবন এবং অসংখ্য প্রশ্ন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারের সংগৃহীত তথ্যের বরাতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সৌদি আরবে ৮৮৭ বাংলাদেশির মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়েছিল; এর প্রায় ৮০ শতাংশকে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল। এ পরিসংখ্যান নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে সব মৃত্যুই অস্বাভাবিক ছিল বা কোনো নির্দিষ্ট মৃত্যুর জন্য নিয়োগকর্তা বা কর্তৃপক্ষ দায়ী। কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে : এত বিপুল মৃত্যুর ক্ষেত্রে কারণ নির্ধারণ, চিকিৎসা তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় ময়নাতদন্ত, পরিবারকে তথ্য দেওয়া এবং সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ একটি চিকিৎসাগত বা প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাস হতে পারে। কিন্তু সেটি কীভাবে নির্ধারিত হলো, মৃত্যুর আগে কর্মপরিবেশ কেমন ছিল, চিকিৎসা পাওয়া গিয়েছিল কি না, অতিরিক্ত শ্রম বা তীব্র তাপের প্রভাব ছিল কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত পরিবারের সন্দেহ দূর হয় না। মৃত্যুর কারণ জানা পরিবারের অধিকার; আবার নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা নিয়ে কার্যকর নীতি নেওয়াও সম্ভব নয়।

তাই দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিদেশে মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকদের বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা গড়া। মৃত্যুর কারণ, তদন্তের অবস্থা, মরদেহ পাঠানোর প্রক্রিয়া, বকেয়া মজুরি ও ক্ষতিপূরণের দাবি এবং পরিবারের সহায়তা— এসব নিয়ে গোপনীয়তা ও পরিবারের সম্মতি রক্ষা করে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা দরকার।

মৃত্যুদণ্ড, কূটনীতি ও জানার অধিকার

গত ১৪ অক্টোবর মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা প্রবাসী অধিকার ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’-সংক্রান্ত অভিযোগের কথা জানিয়েছিল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আগে না পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে এবং পরে সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার কথা জানানো হয়।

এ ধরনের ঘটনায় আবেগের পাশাপাশি তথ্যের যথার্থতা অত্যন্ত জরুরি। অভিযোগের প্রকৃতি, মামলার নথি, আদালতের রায়, আপিলের সুযোগ এবং আইনি প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করা দরকার। তবে একটি মৌলিক নীতি স্পষ্ট : বিদেশে কোনো বাংলাদেশি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলেও তার ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে। অপরাধ প্রমাণিত হলে সে দেশের আইন অনুযায়ী শাস্তি হতে পারে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তিতে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, কার্যকর আত্মপক্ষ সমর্থন, দোভাষী ও আইনজীবীর সহায়তা এবং কনস্যুলার যোগাযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ বিদেশি নাগরিকের কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহিতকরণের বাধ্যবাধকতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান দেয়। ৩৭ অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুসংক্রান্ত কিছু পরিস্থিতিতে কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার বিধান রয়েছে। তবে এসব বিধানের প্রয়োগ নির্ভর করে ঘটনার ধরন, প্রযোজ্য আইন ও রাষ্ট্রগুলোর বাধ্যবাধকতার ওপর। তাই বাংলাদেশের প্রশ্ন তোলার ভিত্তি হওয়া উচিত তথ্য, আইন ও কূটনৈতিক দায়বদ্ধতা।

রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া একটি পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু কার্যকর কূটনীতি সেখানেই শেষ নয়। মামলার তথ্য সংগ্রহ, বিচারপ্রক্রিয়ার নথি পর্যালোচনা, কনস্যুলার যোগাযোগের বাস্তব অবস্থা নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ঘটনাটিকে ‘আমাদের জন্য শিক্ষা’ বলে উল্লেখ করেছেন বলে প্রকাশিত বক্তব্যে উঠে এসেছে। সেই শিক্ষা যেন কেবল সতর্কতার প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে; কী ব্যর্থতা ঘটেছে, কোথায় তথ্যের ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে কী পরিবর্তন আসবে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দরকার।

‘পাপের লাশ’ ও নাগরিকের মর্যাদা

এই বিতর্কে আরও অস্বস্তিকর হলো বিএনপির সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতনের স্টার টিভিতে প্রচারিত মন্তব্য—‘ঐ পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক এটা আমি চাই না।’ একজন জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত মন্তব্যকে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বা পুরো দলের অবস্থান বলা ঠিক হবে না। কিন্তু জনপ্রতিনিধির বক্তব্যের সামাজিক ও নৈতিক তাৎপর্য থাকে, বিশেষ করে যখন সেটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নাগরিকের মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রশ্নে উচ্চারিত হয়।

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো ব্যক্তির অপরাধকে সমর্থন করা বা অস্বীকার করা নয়। প্রশ্ন হলো, অপরাধের বিচার এবং মৃত্যুর পর মানুষের মর্যাদাকে আমরা কীভাবে পৃথক করে দেখি। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার হবে; আদালত প্রমাণ, সাক্ষ্য ও আইন বিবেচনা করে রায় দেবে। কিন্তু কাউকে ‘পাপী’ বলে তার মরদেহ স্বদেশে ফিরতে পারবে কি না—এই প্রশ্নকে নৈতিক শুদ্ধতার পরীক্ষায় পরিণত করা বিপজ্জনক।

মরদেহের কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক অবদান বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই। কিন্তু তার সঙ্গে থাকে একটি পরিবারের শোক, মা-বাবার অপেক্ষা, সন্তানের স্মৃতি এবং প্রিয়জনকে শেষবার দেখার আকুতি। মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করা মানে অপরাধকে সমর্থন করা নয়; এটি স্বজনের শোক প্রকাশের সুযোগ, পারিবারিক ও ধর্মীয় রীতির প্রতি সম্মান এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের ন্যূনতম মানবিক দায়বদ্ধতা।

নাগরিকত্ব কোনো পুরস্কার নয়, যা রাষ্ট্র ভালো আচরণের বিনিময়ে দেবে। এটি অধিকার ও দায়িত্বের সম্পর্ক, যা আইনের শাসনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হওয়ার কথা। আইনের শাসন মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা নয়; বরং অভিযোগের মুখেও আইনানুগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তিগত ঘৃণাকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে না দেওয়া।

রাষ্ট্র যদি কেবল সফল নাগরিককে সম্মান জানায়, অথচ বিপদগ্রস্ত নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নাগরিকত্বের ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রবাসীর মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি শ্রমবাজারের নিরাপত্তা, কূটনীতির কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্রের নৈতিকতার পরীক্ষা। রেমিট্যান্স নেওয়ার সময় প্রবাসী যেমন আমাদের, তেমনি তার মৃত্যুর পরও তিনি আমাদের—তার পরিবারের শোক, সত্যের দাবি এবং মর্যাদার প্রশ্নেও।

লেখক : কলামিস্ট


কেকে/সাশ 


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রবাসীর মৃত্যু   রাষ্ট্রের দায়   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close