বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁসে বিএআরসির সহকারী পরিচালক গ্রেপ্তার      ● বিজয়া দশমী আজ, মণ্ডপে মণ্ডপে বিদায়ের সুর      ● চট্টগ্রামের জেএম সেন হল পূজামণ্ডপ পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর      ● এ বছর ৪০ লাখ কৃষক পাবেন কৃষি কার্ড : প্রধানমন্ত্রী      ● রাজশাহীতে ৩৮৯৭০ আখচাষিকে ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী      ● হামে শিশু মৃত্যু ১২০০ ছাড়াল      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৩৬৬      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ভারতের যুব আন্দোলন কেন জুলাই অভ্যুত্থানের নিরিখে ভিন্ন
পূর্ণিমা চৌহান
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১৮ পিএম আপডেট: ২১.১০.২০২৬ ১:২০ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তরুণদের আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কর্মসংস্থানের দাবি, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা—বিভিন্ন ইস্যুতে তরুণেরা বারবার রাজপথে নেমেছেন। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের অক্টোবরে দিল্লিতে সিজেপি আন্দোলনকে ঘিরে চলমান বিতর্ক এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতারই অংশ।

ভারতের যুব আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ নেহা বোরা বলেছেন, ভারতের জেন-জি বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। কিন্তু কোনো আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া আর দুটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এক করে দেখা কি একই বিষয়? অনেকেই দিল্লির আন্দোলনকে বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করছেন।

কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দিয়ে ভারতের বর্তমান আন্দোলনকে বিচার করা কতটা যুক্তিসংগত? দুই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্দোলনের পরিণতির পার্থক্য কি এই তুলনায় যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে? উভয় দেশের আন্দোলনই আলোচনার দাবি রাখে, তবে সেগুলো বুঝতে হলে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মানবিক মূল্য

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে দ্রুত একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে পরিণত করে। কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতার পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ, আহতদের দীর্ঘ যন্ত্রণা এবং স্বজন হারানো পরিবারগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। এটি একটি আনুমানিক হিসাব, তবে সহিংসতার ভয়াবহতা বোঝার জন্য এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

সরকারি হিসাবেই নিহতের সংখ্যা ৮৩৪ জন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন যে বিপুল মানবিক মূল্য দাবি করেছে, তা উপেক্ষা করে এই অভ্যুত্থানকে কেবল একটি রাজনৈতিক সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখা যায় না।

অন্যদিকে, দিল্লির সিজেপি আন্দোলন নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে প্রায় ৫,০০০ মানুষকে আটক করার কথা বলা হয়েছে। তাদের সন্ধ্যায় মুক্তি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য এবং আটকের প্রকৃত পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে যাচাই না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। আটক হওয়া এবং প্রাণ হারানো সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা; দুটি পরিস্থিতিকে একই মানদণ্ডে বিচার করাও যুক্তিসংগত নয়।

নেহা বোরা কিংবা ভারতের অন্য তরুণ নেতাদের বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অনুপ্রেরণার জন্য সেই আন্দোলনের পেছনের আত্মত্যাগ ও বাস্তবতা বোঝা প্রয়োজন। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং সংঘাতের পরিণতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। শুধু বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করলেই কি সেই দেশের মানুষের ত্যাগ ও দুর্ভোগের গভীরতা উপলব্ধি করা সম্ভব?

ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান : ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা

ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ এই নয় যে ভারতের গণতন্ত্র ত্রুটিমুক্ত কিংবা তার প্রতিষ্ঠানগুলো সমালোচনার ঊর্ধ্বে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, পুলিশের ভূমিকা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক অধিকার। বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য নাগরিকদের এই অধিকার অপরিহার্য।

ভারতের ইতিহাসও গণতন্ত্রের দুর্বলতা ও পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তুলে ধরে। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, সংবাদমাধ্যমে সেন্সরশিপ আরোপ করা হয় এবং বিরোধী নেতাদের আটক করা হয়। কিন্তু ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয় দেখিয়েছিল, নির্বাচনি প্রতিযোগিতা ক্ষমতার পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে।

এই ইতিহাসের দুটি শিক্ষা রয়েছে। প্রথমত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা, রাজনৈতিক বিরোধিতা প্রকাশ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলে অসন্তোষ জানানোর একাধিক পথ তৈরি হয়। তাই দিল্লির সিজেপি আন্দোলনকে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। 

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে, সেগুলোর প্রমাণভিত্তিক পর্যালোচনা হওয়া উচিত। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলেই তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সঠিক, এমনটিও নয়। মূল বিষয় হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান ভুল করলে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পাওয়া যায় কি না। 

ভারতের গণতন্ত্রের একটি সম্ভাব্য শক্তি হলো-নাগরিকদের আদালতের দ্বারস্থ হওয়া, সংবাদমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি করা, রাজনৈতিক বিরোধিতা প্রকাশ করা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ। তবে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তবে সেগুলো কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে তার ওপর। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভারতের আন্দোলনকারীদের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে, কিন্তু ভারতের নিজস্ব সাংবিধানিক ব্যবস্থার সম্ভাবনাকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়।

জুলাই অভ্যুত্থানের আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ ছিল। ভারতের পরিস্থিতি সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়। দুই দেশের এই পার্থক্য স্বীকার করাই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যথাযথভাবে বোঝার প্রথম শর্ত।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা, কিন্তু ভারতকে সরলীকরণ নয়

বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৫ সালে নেপালের জেন-জি আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাজপথের আন্দোলনের সমন্বয়ে তরুণেরা দ্রুত জনমত সংগঠিত করতে পারেন। কিন্তু একটি দেশে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে বলেই অন্য দেশেও একই ধরনের আন্দোলন একই পরিণতি নিয়ে আসবে- এমন ধারণা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।

ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিশাল ও বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সরকার রয়েছে। বহুদলীয় প্রতিযোগিতা, নিয়মিত নির্বাচন এবং বিস্তৃত নাগরিক সমাজ রাজনৈতিক বিতর্ককে নানা মাত্রা দিয়েছে। ভাষা, সংস্কৃতি, সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের বৈচিত্র্যও ভারতের গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতাকে স্বতন্ত্র করেছে। সংবিধান নাগরিকদের অসন্তোষ প্রকাশ এবং ক্ষমতাসীনদের চ্যালেঞ্জ করার একাধিক পথ তৈরি করেছে।

তাই ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে- এমন দাবি যথাযথ প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের মুক্ত পরিবেশ এবং পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বিরোধী আন্দোলনকে নিছক রাজনৈতিক নাটক হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যেমন ভুল, তেমনি প্রতিটি প্রতিবাদকে অনিবার্য গণ-অভ্যুত্থানের পূর্বাভাস হিসেবে দেখাও যুক্তিসংগত নয়।

এখানেই নেহা বোরার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের আন্দোলন যদি ভারতের তরুণদের অনুপ্রাণিত করে, তাহলে তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু প্রকৃত রাজনৈতিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগ, সহিংসতার ভয়াবহতা এবং অভ্যুত্থানের জটিল পরিণতি স্বীকার করতে হবে। একইসঙ্গে ভারতের নিজস্ব গণতান্ত্রিক ইতিহাস ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নও জরুরি।

গণতন্ত্রের শক্তি শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা, নাগরিক অধিকার রক্ষা করা এবং ভিন্নমত প্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা। বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ভারতের তরুণদের রাজনৈতিক চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে দেশটির নিজস্ব নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। 

বাংলাদেশের আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে এবং ভারতের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণেরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবেন, যেখানে ক্ষমতাসীনদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে নাগরিকের অধিকার বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে? নেহা বোরাদের সেইদিকেই মনোযোগ দিতে হবে।
 
লেখক : এশিয়ান কলেজ অব জার্নালিজমের প্রাক্তন সাফ-মদনজিৎ সিং ফেলো


কেকে/সাশ 




আরও সংবাদ   বিষয়:  ভারতের যুব আন্দোলন   জুলাই অভ্যুত্থান  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close