ইসরায়েলি পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম এবং রাচেল সজোরের তথ্যচিত্র ‘নাজা’-তে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি অভিজাত ইউনিটের সেনাসদস্যদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, যারা গণহত্যার লক্ষ্যবস্তু সরবরাহ করেছিল। যারা এই তথ্যচিত্রটি দেখেছেন, তাদের অনেকের মতোই আমিও এমন নতুন কিছু শিখিনি যা মিডল ইস্ট আই বিগত তিন বছর ধরে প্রতিদিন রিপোর্ট করেনি।
তবে আশার কথা হলো, দ্য গার্ডিয়ান সংবাদপত্রটি এই চলচ্চিত্রের পেছনে নিজেদের নাম যুক্ত করে দেরিতে হলেও পরিস্থিতি অনুধাবন করার চেষ্টা করছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাজায় দুই বছরের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পর এই উদারপন্থি পত্রিকাটি তাদের সম্পাদকীয় অবস্থান পরিবর্তন করে সেখানে ‘গণহত্যা’ চলছে বলে স্বীকার করে নেয়। ততদিনে অন্তত ৭০,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং পুরো গাজা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি উদারপন্থি সংবাদপত্রের জন্য এমন একটি নিধনযজ্ঞ অস্বীকার করে সময়ক্ষেপণ করা সত্যিই এক দীর্ঘ সময়।
কিন্তু সিনেমা হলে বসে আমি ভাবছিলাম— আমার পাশে আর কাদের বসে এই তথ্যচিত্রটি দেখা উচিত?
আমার প্রথম পছন্দ হবেন জনগণের প্রতিনিধি, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম নিজে। লেবার পার্টির নেতা হিসেবে তার প্রথম কাজ কি গাজা ইস্যুতে দলের অতীত ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া ছিল না? তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড কি প্রথম ব্রিটিশ মন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সেই ঐতিহাসিক মতামতের সঙ্গে যুক্তরাজ্যকে যুক্ত করেননি, যেখানে পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল?
এই দুই নেতা বারবার বলেছিলেন যে তারা ঘটনাটি ‘বুঝতে পেরেছেন’। কিন্তু তারা আসলে কী বুঝেছেন?
এই সংঘাতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘নাজা’ তথ্যচিত্রে এমন কিছু নারী ও পুরুষের সরাসরি জবানবন্দি দেখা গেছে, যারা ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের জন্য নিয়োজিত একটি অভিজাত গোয়েন্দা ইউনিটের সদস্য ছিলেন। বলে রাখা ভালো, এটি কেবল সূচনা মাত্র। পুরো একটি জাতিকে সমুদ্রে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে আরও অনেক সেনার জবানবন্দি আসা বাকি রয়েছে।
আমরা আগেই জানতাম, গাজার প্রতিটি ব্লকের প্রতিটি ফ্ল্যাটে কী ঘটছে তারা সবকিছু শুনতে পেত। প্রতিটি মোবাইল ফোন একেকটি মাইক্রোফোন হিসেবে কাজ করত। প্রতিটি পরিবারের কতজন সদস্য ভেতরে জীবিত আছে এবং প্রতিটি হামলায় কতজন বেসামরিক নাগরিক মারা যাবে—তার হিসাব তাদের কাছে থাকত। তারা প্রতিটি হামলা এমনভাবে পরিকল্পনা করত যাতে মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ করা যায়। সাক্ষাৎকার দেওয়া একজন সদস্য নোটপ্যাডে এঁকে দেখিয়েছেন যে কীভাবে তারা ব্লক ধরে ধরে এই কাজ করত। প্রতিটি হামলার আগে ও পরে কোন ভবনে কতজন মানুষ আছে, তা রঙের সংকেত দিয়ে লিপিবদ্ধ করে রাখা হতো।
গণহত্যাকারী ‘অভিজাত’ শ্রেণি
‘ল্যাভেন্ডার’ ছিল এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রোগ্রাম, যা নিম্নপর্যায়ের হামাস অপারেটিভদের’ শনাক্ত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। এই সিস্টেমে ভুলের মাত্রা ছিল অনেক বেশি, যার ফলে প্রচুর বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু ঘটে। তবে ব্যবহারকারীদের মতে, এটি কোনো সিস্টেমের ক্রুটি বা ত্রুটি ছিল না—বরং এটিই ছিল এই প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য।
আব্রাহাম জানান, যারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন তাদের মতে, এটি গাজায় প্রায় ৩৭,০০০ ফিলিস্তিনিকে চিহ্নিত করেছিল—যা সংঘটিত মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক।
এই এআই প্রোগ্রামটি তখন হামলার সংকেত দিত, যখন এটি শিশুদের আনন্দের চিৎকার বা ‘বাবা বাড়ি এসেছে’-র মতো কথা শনাক্ত করতে পারত।
টেল আবিবে বসে সেই প্রযুক্তি পরিচালনাকারী পুরুষরা হেডফোনে শুনতে পেত যে লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানা হয়েছে—এবং নিশ্চিত করার সংকেত হিসেবে পুরুষ, নারী ও শিশুরা জীবন্ত পুড়ে মরছে বা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ছে।
টেল আবিবের শহরের কেন্দ্রস্থলের ছাদগুলোতে আব্রাহাম যখন সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, তখন দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসছিল। এই নীরবতা তখন তৈরি হতো যখন তিনি সেই সেনাদের জিজ্ঞেস করতেন—তারা যা করেছে তা নিয়ে তাদের অনুভূতি কী?
একজন বলল, সে বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি কারণ সে সিস্টেমটিকে বিশ্বাস করত। অন্য একজন বলল, ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ ফিলিস্তিনিদের মৃতদেহ যখন কুকুরে খাচ্ছিল, তখন তার সহকর্মীরা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল, তবে সে নিজে তা দেখতে পারেনি।
কিন্তু খাবার সংগ্রহ করতে আসা মানুষগুলো কীভাবে জানবে যে গোলাগুলির সীমান্তরেখা কোথায়? ‘সেটি রক্ত দিয়ে চিহ্নিত করা ছিল’—সেনাটি অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দিল, যেন এটি খুবই স্বতঃসিদ্ধ বিষয়।
সেই অদৃশ্য সীমান্তরেখা কে পার হলো তা তাদের কাছে কোনো বিষয় ছিল না। স্ক্রিনে একটি ছোট ছেলে ভেসে উঠল, আর তাকেও গুলি করে হত্যা করা হলো।
এই সেনাসদস্যরা ইসরায়েলের সেনাবাহিনী এবং সার্বিকভাবে ইসরায়েলি সমাজের একটি অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। ডিজিটাল দক্ষতায় তাদের খ্যাতি রয়েছে। এই সেরা থেকে সেরা পর্যায়ে পৌঁছাতে অনেক বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এরা বন্দুক ও লাঠি উঁচিয়ে আসা উগ্র দখলদার নয়। এরা কোনো ধর্মান্ধ ব্যক্তি বলে মনে হয় না। কাজের শিফট শেষে তারা খুব সহজভাবেই আবার একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ শহরের সঙ্গে মিশে যায়। আপনি এদের খুব সহজেই কোনো সুশি বার কিংবা ইয়োগা ক্লাসে আবিষ্কার করতে পারবেন।
তারা ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থি ইসরায়েলি সমাজের প্রাণকেন্দ্র থেকে এসেছে এবং সেখানেই বসবাস করে—যে সমাজ মরুভূমিতে একটি আধুনিক নগরী গড়ে তোলার জন্য গর্ববোধ করে।
এরাই সেই ইসরায়েলি, যারা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিচার বিভাগীয় অভ্যুত্থান বা সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনের অভাবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিত।
আব্রাহাম তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন—তার কী মনে হয়, সে কতজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে? তাকে তা চিন্তা করতে হলো। আব্রাহাম জেরা করে জানতে চাইলেন—শত শত নাকি হাজার হাজার? সে বেশ হালকাভাবেই জবাব দিল—‘সম্ভবত হাজার হাজার।’
আমি তাদের কণ্ঠে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বা অপরাধবোধ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছি। এটি হলো ‘জেন জি’ দের পরিচালিত গণহত্যা। একজন তো স্পষ্টই বলেছে যে সে কাজটি উপভোগ করেছে। সে বলেছে, একটি মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করে সে হাসিমুখে বাড়ি ফিরত।
বার্নহামের বাঁধাধরা চিন্তাভাবনা
লন্ডনে ফিরে আসার পর দেখা গেল, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মিলিব্যান্ডের শক্ত অবস্থান মাত্র দশ দিন স্থায়ী হয়েছিল।
এই অল্প সময়ের মধ্যে, যুক্তরাজ্য কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় ২০ জন ব্রিটিশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করা এবং পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেটের মর্যাদা কমিয়ে আনাকে তিনি বশ্যতা স্বীকার করে মেনে নেন।
এদিকে, বার্নহামও দ্রুত মূলধারার বাঁধাধরা রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় ফিরে যান। তিনি গ্রিন পার্টির একটি প্রস্তাবকে ‘সেমিটিজম-বিরোধী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানান, যেখানে বলা হয়েছিল—‘জিওনিজম হলো বর্ণবাদের একটি রূপ’।
কিন্তু ইতিহাস বা নৈতিকতার কোন মানদণ্ডে এমন এক ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার থাকতে পারে, যা রিয়েল-টাইমে একটি গণহত্যা পরিকল্পনা করে ও তা কার্যকর করে চলেছে?
অতএব, একটি খুবই স্পষ্ট কিন্তু জরুরি প্রশ্ন রয়েছে যার উত্তর এখন এই দুই নেতার দেওয়া উচিত। আদালতের বিষয় বলে তারা আর এড়িয়ে যেতে পারেন না। তারা শুনতে পাননি এমন ভানও করতে পারেন না।
যদি ইসরায়েল রাষ্ট্র রিয়েল-টাইমে একটি গণহত্যা পরিকল্পনা, আয়োজন ও পরিচালনা করে এবং দেশটির উদারপন্থি যুবসমাজের সেরা প্রতিনিধিরা টু শব্দ না করে সেই প্রকল্পে অংশ নেয়—তবে বার্নহাম এবং মিলিব্যান্ড ইসরায়েলের কোন কাল্পনিক রোমান্টিক রূপকে সমর্থন করছেন?
জিওনিস্ট স্বপ্নের কোন সংস্করণটি নৈতিক? কোন ইসরায়েল নীতিগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়?
পোল পটের কাম্পুচিয়া, পিনোচেতের চিলি, বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা থার্ড রাইখ (নাৎসি জার্মানি)-এর কি অস্তিত্বের অধিকার ছিল? তাদের ছিল না। তাদের নিশ্চিহ্ন করতে বিশ্বযুদ্ধ, বিপ্লব এবং প্রচুর রক্তপাতের প্রয়োজন হয়েছিল।
তাহলে ইতিহাস বা নৈতিকতার কোন মানদণ্ডে এমন এক ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার থাকতে পারে, যা একটি গণহত্যা সংগঠিত করে চলেছে?
কারণ একটি বিষয় নিশ্চিত : এই গণহত্যা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং সুসংগঠিত। ইসরায়েলি জেনারেলরা যখন বলেন যে তাদের প্রতিটি বুলেটের হিসেব তাদের জানা আছে, তখন তারা মিথ্যা বলেন না।
লেখক : ‘মিডল ইস্ট আই’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক
কেকে/সাশ