উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও জ্বালানি অনিশ্চয়তা—এই তিন চ্যালেঞ্জের চাপে দেশের অর্থনীতি আজ কঠিন সময় পার করছে। দুর্বল বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, আর ব্যবসা-বাণিজ্য ও নতুন কর্মসংস্থানের গতি শ্লথ হয়ে পড়ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে সংকট মোকাবিলার নানা উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন, তিন থেকে চারটি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুতে কর ছাড়ের কথা বলেছেন। খুলনার কাছে গভীর পানির নতুন টার্মিনালের পরিকল্পনাও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার দিকে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা পাঁচ বছরের জন্য একই করহার বজায় রাখা, বন্ধ কারখানা চালুর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ এবং মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদে ঋণের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। নীতির ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের জন্য নিঃসন্দেহে জরুরি।
তবে ঘোষণা আর বাস্তবায়ন এক নয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, পরিকল্পনা কাগজে যত বড়ই হোক, মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতাই শেষ পর্যন্ত আস্থা তৈরি করে। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের পর্যবেক্ষণ এখানে প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, বর্তমান দুরবস্থার পেছনে অর্থের অভাবের চেয়ে আস্থার সংকটই প্রধান। উচ্চ দারিদ্র্য, নিম্ন বিনিয়োগ ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির চক্র ভাঙতে না পারলে কোনো উদ্যোগই টেকসই হবে না। অর্থের অপচয়, অব্যবহৃত অবকাঠামো এবং মানসম্মত শিক্ষার অভাবে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতিও এই চক্রকে আরও দৃঢ় করছে।
আইএমএফের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে, কিন্তু সংস্কার না এগোলে তা আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আট মাসে জ্বালানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার। এই চাপ সামলাতে কালক্ষেপণের সুযোগ নেই।
দেশের এই পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও জবাবদিহির কাঠামো মেনে বাস্তবায়ন করা। জ্বালানি প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে দ্রুত অগ্রগতি দেখাতে হবে। অর্থ পাচার রোধ ও অপচয় বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবার বিকল্প নেই। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের ভিত্তি মজবুত করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি জোরদার করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ কমাতে হবে। মনে রাখতে হবে অর্থনীতির সংকট কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন।
সরকারের উদ্যোগগুলো যদি বাস্তব ফল দিতে পারে, তবেই বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরবে। সেই আস্থা ফেরানোই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
কেকে/সাশ