এক পাশে মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়, অন্য পাশে মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন। আজানের সময় থেমে যায় মণ্ডপের মাইক ও বাদ্যযন্ত্র, আবার নামাজ শেষে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও আরতিতে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। এভাবেই ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের মানুষ।
বুধবার (২১ অক্টোবর) দুর্গাপূজার দশমীতে সরেজমিনে দেখা যায়, মনোহরপুর বাজারসংলগ্ন এলাকায় একটি মসজিদের অল্প দূরত্বেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনটি মন্দির। দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকায় মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করছেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বজায় রেখেছেন সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান।
দুপুরে যোহরের আজানের আগে পূজামণ্ডপের মাইক ও বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। এ সময় মুসল্লিরা মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে পূজামণ্ডপে সমবেত হন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দেবীর চরণে প্রণাম, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও আরতি শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
সন্ধ্যার পর মণ্ডপে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি মুসলিম পরিবারের নারী-পুরুষেরাও তা উপভোগ করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ আয়োজন দেখতে আশপাশের এলাকা থেকেও বিভিন্ন বয়সী মানুষ পরিবার নিয়ে আসেন।
গ্রামবাসীরা জানান, মনোহরপুরে দীর্ঘদিন ধরেই দুই সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করছেন। স্থানীয় মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের সুবিধার জন্য ১৯৭৫ সালের দিকে মনোহরপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে মসজিদের দক্ষিণ পাশে মন্দির নির্মাণ করা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার পালনের জন্য ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মনোহরপুর আদিবাসী শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির। পরবর্তী সময়ে আরও দুটি মন্দির গড়ে ওঠে।
মনোহরপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের সভাপতি ও মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন, গ্রামে কখনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। মুসলমানদের নামাজের সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মাইক ও বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখেন। একইভাবে পূজার আয়োজনেও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সহযোগিতা করেন। পারস্পরিক সম্মানই তাঁদের সহাবস্থানের মূল ভিত্তি।
মনোহরপুর আদিবাসী শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের সভাপতি শ্রী অর্জুন বলেন, পূর্বপুরুষদের দেখানো সম্প্রীতির পথ ধরে বর্তমান প্রজন্মও একে অপরের ধর্মকে শ্রদ্ধা করছে। ঈদ ও পূজার মতো উৎসবে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের আনন্দে অংশ নেন।
মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুর রশিদ জানান, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান উদ্যাপনের বিষয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত গ্রামে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান শেখ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। তাঁর মতে, মনোহরপুরের এই সহাবস্থান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
কেকে/সাশ