আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুর শোক থেকে যে আন্দোলনের সূচনা, ২০১৭ সালে তা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৮ সালের শিক্ষার্থী আন্দোলনের পর নতুন সড়ক পরিবহন আইনও হয়েছে। কিন্তু তিন দশক পরও মূল প্রশ্নটি অমীমাংসিত : সড়ক কি নিরাপদ হয়েছে? প্রাপ্ত তথ্য বলছে, হয়নি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে ২০২৫ সালে সড়কে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৫৯ জন, আহত ১৬ হাজার ৪৭৬ জন; ২০২৪ সালে নিহত ছিলেন ৭ হাজার ২৯৪ জন। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাবে ২০২৫ সালে নিহত ৯ হাজার ১১১ জন, আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। চলতি বছরেও ছবি বদলায়নি; সেপ্টেম্বরে নিহত ৪২৩ জন, অর্থাৎ দিনে গড়ে ১৪ জন।
তবে এ সংখ্যাগুলো সংবাদ প্রতিবেদনভিত্তিক, আর পুলিশের নথিভুক্ত সংখ্যা তার চেয়েও কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মডেলভিত্তিক অনুমানে বার্ষিক মৃত্যু ২৫ হাজারের বেশি। হিসাবের এ বিশাল ফারাক প্রমাণ করে, সমস্যার প্রকৃত মাত্রাই আমরা জানি না; যা সঠিকভাবে মাপা হয় না, তার প্রতিকারও হয় না। ক্ষতির চেহারা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে নিহতদের প্রায় ৭৮ শতাংশ ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সি কর্মক্ষম মানুষ; দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশে জড়িত মোটরসাইকেল। ঢাকায় নিহতদের ৪৭ শতাংশের বেশি পথচারী। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রাণহানি কেবল পরিবারের নয়, দেশের উৎপাদনশীলতারও ক্ষতি।
বিশ্ব দেখিয়েছে, এই মৃত্যু অনিবার্য নয়। ডব্লিউএইচওর ২০২৩ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে বার্ষিক সড়ক মৃত্যু কমে ১১ লাখ ৯০ হাজারে নেমেছে; ১০টি দেশ মৃত্যু অন্তত অর্ধেক কমিয়েছে, ৮৫টি দেশে কমেছে ১০ থেকে ৪৯ শতাংশ। বড় অগ্রগতি এসেছে সেখানে, যেখানে ‘নিরাপদ ব্যবস্থা’ পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ মানুষের ভুল মেনে নিয়ে এমন সড়ক, যান ও আইন গড়া, যাতে ভুলের মাশুল প্রাণ না হয়। সুইডেনের ‘ভিশন জিরো’ ও নেদারল্যান্ডসের পথচারীবান্ধব অবকাঠামো তার উদাহরণ। জাতিসংঘের ২০২১-৩০ কর্মদশকের লক্ষ্য মৃত্যু ও আঘাত অর্ধেকে নামানো; বাংলাদেশে সংখ্যা সেদিকে নামছে না বরং বেড়ে চলছে।
এই পরিস্থিতিতে আমরা মনে করছি সসরকারে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অতীব জরুরি। প্রথমত পুলিশ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিআরটিএ ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মিলিয়ে একটি জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়া এবং বছরে অন্তত একবার তা প্রকাশ করা।
দ্বিতীয়ত মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দায়িত্ব ও সময়সীমা নির্ধারণ করে একটি পরিমাপযোগ্য বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা নেওয়া এবং পরবর্তী ২২ অক্টোবর প্রকাশ্য মূল্যায়ন করা।
তৃতীয়ত দখলমুক্ত ফুটপাত ও নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করা; স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার এলাকায় গতিসীমা কার্যকর করা।
চতুর্থত মোটরসাইকেলের হেলমেট বাধ্যতামূলক করা, আঞ্চলিক সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সংশোধন এবং ধীরগতির যান মহাসড়কমুক্ত রাখা। এবং সবশেষশে যানবাহনের ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স প্রক্রিয়া দুর্নীতিমুক্ত করা এবং প্রশিক্ষণ, কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের নিয়ম মানা। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার, অ্যাম্বুলেন্স ও ট্রমা চিকিৎসায় সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং সড়ক নিরাপত্তায় আলাদা বাজেট বরাদ্দ দেওয়া।
সড়ক দুর্ঘটনাকে নিয়তি বলে মেনে নেওয়ার সময় শেষ। নাগরিক, চালক, পরিবহনমালিক ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব আছে, তবে নেতৃত্ব দেওয়া, সংস্থাগুলোর কাজ সমন্বয় করা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দিবসটি তখনই সার্থক হবে, যখন আগামী ২২ অক্টোবরে বলা যাবে, এ বছর মৃত্যু কমেছে এবং তার প্রমাণও আমাদের হাতে আছে।
কেকে/ এমএস