বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৬ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে দিশেহারা ব্যবসায়ীরা      ● সৌহার্দ্য ও দেশপ্রেম জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ক্রীড়া : প্রধানমন্ত্রী      ● সৌদি আরবের তিন রুটে বিমানের ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত      ● ঢাকা-সৌদি রুটের ১৩৪ ফ্লাইট বাতিল, ভোগান্তিতে যাত্রীরা      ● হাম উপসর্গে একজনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১০১০      ● ডেঙ্গুতে আরও ৭ জনের মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৩৬৪      ● টঙ্গীতে গ্যাস সিলিন্ডারের আগুনে একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
স্থানীয় নির্বাচন : প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান
এম ডি জিয়াবুল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০৭ এএম

ভোটের মৌসুমে জনপদের অলিগলি জুড়ে প্রতিশ্রুতির যে পসরা সাজে, নির্বাচনের পর তার কতটুকু মানুষের দুয়ারে পৌঁছায়—সেই হিসাবই গণতন্ত্রের প্রকৃত আয়না। প্রার্থীর কণ্ঠে তখন উন্নয়নের অমিয় বচন, জনসেবার দৃপ্ত অঙ্গীকার, দুর্ভোগ মোচনের প্রত্যয়। ভগ্ন সড়ক হবে চলাচলের উপযোগী, জলকষ্টের অবসান ঘটবে, বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের পথ খুলবে, দরিদ্রের দুয়ারে পৌঁছাবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা। অথচ নির্বাচনি উত্তাপ প্রশমিত হলে বহু জনপদে সেই অঙ্গীকারের প্রতিধ্বনি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে। 

প্রতিশ্রুতির জৌলুস আর জনজীবনের রূঢ় বাস্তবতার মাঝখানে তখন জমতে থাকে অনাস্থার পলিমাটি। স্থানীয় নির্বাচন নিছক পদ-পদবি বণ্টনের আয়োজন নয়; এটি জনজীবনের মৌলিক প্রয়োজন, নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সেবাপ্রাপ্তির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ কিংবা পৌরসভার সিদ্ধান্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে। 

একটি চলাচল-অনুপযোগী সড়ক শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়যাত্রা ব্যাহত করে, বিশুদ্ধ পানির সংকট জনস্বাস্থ্যে বিপর্যয় ডেকে আনে, আর সরকারি সহায়তা বণ্টনে অনিয়ম অসহায় মানুষের প্রাপ্য অধিকারকে সংকুচিত করে। অতএব স্থানীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা কোনো বিমূর্ত প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এর অভিঘাত পড়ে মানুষের ভাতের থালা, চিকিৎসার সুযোগ, শিক্ষার পরিসর এবং জীবিকার ওপর। 

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেক সময় কর্মপরিকল্পনার চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব, অর্থবিত্তের দাপট, আত্মীয়তার সমীকরণ ও সাময়িক আবেগ অধিক গুরুত্ব পায়। জনপদের সমস্যা নিয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপনের পরিবর্তে মঞ্চ কাঁপানো বক্তৃতা কিংবা আবেগঘন আশ্বাসেই ভোটারের মন জয়ের চেষ্টা চলে। অথচ উন্নয়ন কোনো বাগ্মিতার অলংকার নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রয়োজন নিরূপণ, আর্থিক সংস্থান, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা। যে প্রতিশ্রুতির পেছনে সামর্থ্য ও পরিকল্পনার ভিত্তি নেই, তা নির্বাচনি প্রচারের অনুষঙ্গ হতে পারে, জনকল্যাণের নির্ভরযোগ্য অঙ্গীকার নয়। 

এ কথা অস্বীকারের অবকাশ নেই যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কর্মপরিধি সর্বত্র সমান নয়। বরাদ্দের অপ্রতুলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীনতা অনেক উন্নয়ন উদ্যোগকে মন্থর করে। বিশেষত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে যোগাযোগের প্রতিকূলতা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জনবসতি এবং সেবাপ্রাপ্তির ভৌগোলিক বাধা উন্নয়নকে আরও দুরূহ করে তোলে। কিন্তু সীমাবদ্ধতার বাস্তবতা যেমন স্বীকার করতে হবে, তেমনি সেই সীমাবদ্ধতা নিরসনে জনপ্রতিনিধির উদ্যোগ, তৎপরতা ও দায়বদ্ধতাও পরিমাপ করতে হবে। কোথায় কাজ আটকে আছে, কেন আটকে আছে, সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জনগণকে এসব জানানোর নৈতিক দায়িত্ব নির্বাচিত নেতৃত্বেরই। 

নির্বাচনি ইশতেহার নিছক কাগুজে ঘোষণাপত্র হয়ে থাকলে চলবে না। প্রতিটি অঙ্গীকারের সঙ্গে থাকতে হবে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা, সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব, সময়সীমা এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা। কোন সমস্যা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন, কোনটির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন, আর কোন উদ্যোগের সঙ্গে একাধিক দপ্তর সম্পৃক্ত এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। এতে অবাস্তব প্রতিশ্রুতির প্রবণতা কমবে, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণও নির্ণয় করা সহজ হবে। জনগণের প্রত্যাশাকে পুঁজি করে অসাধ্য সাধনের ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে সামর্থ্যরে সীমা মেনে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি উপস্থাপন অধিক দায়িত্বশীল আচরণ।

এখানে ভোটারের বিবেচনাবোধও গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থীর বাহ্যিক চাকচিক্য কিংবা প্রচারণার ব্যাপকতা তার জনসেবার যোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। এলাকার সংকট সম্পর্কে তার উপলব্ধি, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, সততা, জনসম্পৃক্ততা এবং জবাবদিহির মানসিকতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ভোট দেওয়ার আগে প্রার্থীর কাছে জানতে চাওয়া উচিত তিনি কোন কাজটি অগ্রাধিকার দেবেন, কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবেন এবং অগ্রগতি যাচাইয়ের সুযোগ জনগণকে কীভাবে দেবেন। এমন প্রশ্ন কোনো বিরুদ্ধাচরণ নয়; সচেতন নাগরিকত্বের স্বাভাবিক প্রকাশ।

নির্বাচিত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধির সঙ্গে জনগণের সম্পর্কও যেন বিচ্ছিন্নতার দেয়ালে আটকে না যায়। নিয়মিত জনশুনানি, উন্মুক্ত বাজেট আলোচনা, উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা স্থানীয় শাসনকে অধিক স্বচ্ছ করতে পারে। সরকারি বরাদ্দ কোথায় ব্যয় হলো, কোন প্রকল্প কত দূর এগোল, কারা সুবিধা পেলেন এসব তথ্য নাগরিকের নাগালে থাকা উচিত। 

উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি কোনো জনপ্রতিনিধির মর্যাদাহানি নয়; জনআস্থার ভিত্তি সুদৃঢ় করার অন্যতম শর্ত। দুর্গম পাহাড়ের জনপদে এ প্রশ্নের তাৎপর্য আরও গভীর। আলীকদমের মতো অঞ্চলে একটি সড়ক নির্মাণ কিংবা স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের অর্থ কেবল অবকাঠামো বৃদ্ধি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিচ্ছিন্ন মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংযোগ, জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা এবং শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ। 

পাহাড়ি জনপদের বাস্তবতা না বুঝে উন্নয়নের অভিন্ন ছক চাপিয়ে দিলে মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই স্থানীয় নির্বাচনের অঙ্গীকারে ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং দুর্গমতার কারণে সৃষ্ট বৈষম্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।

গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি শুধু ব্যালটের অঙ্কে নয়, নির্বাচিত নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডে জনআস্থার স্থায়িত্বেও নিহিত। ভোটের আগে উচ্চারিত প্রতিটি অঙ্গীকার নির্বাচনের পর দায়িত্বের স্মারক হয়ে থাকা উচিত। জনগণ যদি প্রতিশ্রুতির হিসাব চাইতে না পারে, তবে নির্বাচন ক্রমে পরিণত হয় সাময়িক আশ্বাসের পুনরাবৃত্তিতে; আর জনপ্রতিনিধিত্ব হারায় তার জনকল্যাণমুখী তাৎপর্য।

মনে রাখতে হবে, ভোটার কোনো করুণাপ্রার্থী নয়, জনপ্রতিনিধিও জনপদের অধিপতি নন। ভোটের মাধ্যমে জনগণ কাউকে শাসনের ঔদ্ধত্য দেয় না; দেয় সেবার দায়িত্ব, আস্থার আমানত। সেই আমানতের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে নির্বাচনি বাগাড়ম্বরকে কর্মের প্রমাণে রূপান্তর করতে হবে। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি দিয়ে জনতার ক্ষত ঢেকে রাখা যায় না; মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে হয় কাজের মধ্য দিয়ে। নির্বাচনের প্রকৃত সার্থকতা তাই কে কত বড় অঙ্গীকার করলেন, তাতে নয় কে কতখানি দায় স্বীকার করলেন, কতটা প্রতিকূলতা অতিক্রম করলেন এবং জনপদের ভাগ্যপরিবর্তনে কতটা দৃশ্যমান ভূমিকা রাখলেন, তার মধ্যেই নিহিত।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close