বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৬ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে দিশেহারা ব্যবসায়ীরা      ● সৌহার্দ্য ও দেশপ্রেম জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ক্রীড়া : প্রধানমন্ত্রী      ● সৌদি আরবের তিন রুটে বিমানের ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত      ● ঢাকা-সৌদি রুটের ১৩৪ ফ্লাইট বাতিল, ভোগান্তিতে যাত্রীরা      ● হাম উপসর্গে একজনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১০১০      ● ডেঙ্গুতে আরও ৭ জনের মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৩৬৪      ● টঙ্গীতে গ্যাস সিলিন্ডারের আগুনে একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ইশরাকের পদত্যাগ নয়, মাদক নির্মূলে রাষ্ট্রের জবাবদিহি জরুরি
ওয়াসিম ফারুক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১৯ এএম

বাংলাদেশের বাস্তবতায় মাদক আজ আর কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাধারণ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও আমাদের আগামী প্রজন্মের অস্তিত্বের খুটিতে আঘাত হানা এক সর্বগ্রাসী জাতীয় সংকট। 

সম্প্রতি রাজধানীর পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর রেলস্টেশন সংলগ্ন দীর্ঘদিনের একটি মাদককেন্দ্রে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও সদ্য পদত্যাগ করা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযান এবং পরবর্তীতে তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক আমাদের সামনে মৌলিক বেশকিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। একজন জনপ্রতিনিধির হাতে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকা বা না থাকা কিংবা তার অভিযানের পদ্ধতিগত বৈধতা নিয়ে যে বিতর্ক জন্ম দিয়েছে, তা যদি আমরা কেবল ব্যক্তি ইশরাকের আচরণের ব্যবচ্ছেদেই সীমিত রাখি, তবে তা হবে মূলত প্রকৃত সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ারই একটি প্রয়াস। 

ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের বুরদিউয়ের  ক্ষমতা ও কাঠামোগত সহিংসতার তত্ত্বের ভিত্তিতে বলতে হয়, রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ক্ষমতার আড়ালে যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা কাজ করে, ইশরাক কাণ্ড তারই একটি প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ মাত্র। প্রশ্ন হলো মাদকবিরোধী অভিযানে একজন সংসদ সদস্যকে কেন মাঠে নেমে নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হলো? রাষ্ট্রের পেশাদার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তখন কোথায় ছিল?

এখানেই আমাদের রাষ্ট্র তথা প্রশাসনিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অস্বস্তি ও অন্তর্নিহিত পচনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্যকে যদি নিজের নির্বাচনি এলাকার একটি পরিচিত মাদক স্পট দখলমুক্ত করতে সশরীরে মাঠে নামতে হয়, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক। 

ইশরাক নিজেই গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে তিনি পুলিশকে বারবার বিষয়টি অবহিত করেছেন, উচ্চপর্যায়ে বৈঠক করেছেন, কিন্তু কোনো কার্যকর প্রশাসনিক ফল পাননি। পুলিশের পক্ষ থেকে জনবল ও আধুনিক যানবাহনের সংকটের খোড়া অজুহাত দেওয়া হয়েছে। 

অন্যদিকে গেন্ডারিয়া পুলিশের দাবি, তারা এর আগেও বড় পরিসরে অভিযান চালিয়েছে এবং প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল। এই বিপরীতমুখী বক্তব্যগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের নৈতিক দায়িত্ব। তবে একটি প্রশ্নটি বার বার সামনে আসে ঘুণ্টিঘরের মতো একটি পরিচিত মাদক বিক্রির স্থানে বারবার অভিযান চালিয়েও যদি মাদক ব্যবসা কিছু সময় পর আবার স্বমহিমায় ফিরে আসে, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল হাতে গোনা কয়েকজন ভাসমান মাদকসেবী বা খুচরা বিক্রেতার নয়। এই শিকড় লুকিয়ে রয়েছে প্রশাসনিক কাঠামোর একেবারে গভীরে। 

মাদক কোথা থেকে আসছে, কোন সীমান্ত রুট পেরিয়ে আসছে, কারা এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে, কারা স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের ছত্রছায়ায় এই অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়ছে সেসব সঠিক তথ্য উদ্ঘাটন না করে কেবল দুই-চারজন পকেটমার বা খুচরা বিক্রেতাকে ধরে মিডিয়ায় ছবি তোলানো মানে কেবল লোক দেখানো কার্যক্রম আর ততে মূল শিকড় অক্ষতই রয়ে যায়। 

এই আসল প্রশ্নটিই চলতি বছরের ২৭ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায় অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, দেশের বড় বড় মাদকের চালান তো খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির আশপাশ দিয়ে অর্থাৎ কক্সবাজার-টেকনাফ সীমান্ত রুট দিয়েই দেশে প্রবেশ করে। গয়েশ্বর রায়ের এই বক্তব্যের রাজনৈতিক বা কৌশলগত ভাষা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ও নির্মম সত্যটিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। 

মাদকের ভয়ঙ্কর ও বিশাল চালান যদি পরিচিত রুটগুলো দিয়ে নির্বিঘ্নে দেশে প্রবেশ করতে পারে, তবে রাষ্ট্র কেন সেই দুর্ভেদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা ভাঙতে ব্যর্থ হচ্ছে? গয়েশ্বর রায়ের আরেকটি পর্যবেক্ষণ আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, আইন কার্যকর করার মতো অদম্য রাজনৈতিক সাহস ও সদিচ্ছা থাকতে হবে। 

বাংলাদেশে আইনের কোনো কমতি নেই কঠোর মাদক আইন আছে, আইন প্রয়োগের জন্য আদালত আছে, বিশেষায়িত বাহিনী আছে, নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ আছে এবং সীমান্তে সশস্ত্র নজরদারিও রয়েছে। তা সত্ত্বেও যদি মাদক শহরের অভিজাত অলিগলি পেরিয়ে মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাড়া-মহল্লা এবং গ্রামগঞ্জ ও হাট-বাজারে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তবে নতুন কোনো আইন তৈরির প্রয়োজন নেই প্রয়োজন বিদ্যমান আইনগুলো নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে ইশরাক হোসেনের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তটিকেও আমাদের গভীর ভাবে  মূল্যায়ন করতে হবে। গত ১৯ অক্টোবর তিনি নিজেই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, মাদক নির্মূলের এই পবিত্র অভিযানে তার কোনো কর্মকাণ্ডের কারণে দল বা সরকার যেন কোনোভাবেই বিব্রতকর অবস্থায় না পড়ে, সেটিই তার কাম্য। 

এর আগে তার পদত্যাগ নিয়ে গণমাধ্যমে নানা ধরনের ধোঁয়াশা ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল। এ ঘটনা অন্তত রাজনীতিতে একটি স্বাস্থ্যকর বার্তা দিয়েছে যে, ব্যক্তির ব্যক্তিগত আবেগ বা সংকীর্ণ স্বার্থের চেয়ে দলীয় শৃঙ্খলা, সরকারের ভাবমূর্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ অনেক বেশি ঊর্ধ্বে। কিন্তু অত্যন্ত সংগতভাবেই প্রশ্ন জাগে একজন জনপ্রতিনিধির পদত্যাগের মাধ্যমেই কি এই বিশাল সামাজিক সমস্যার চিরতরে সমাধান হয়ে গেল? উত্তর হলো একদমই না। 

ইশরাক হোসেন পদত্যাগ করেছেন সত্যি কিন্তু গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর, মুন্সীগঞ্জের লৌহজেং গোয়ালিমান্দ্রার বেঁদে পল্লী, রূপগঞ্জের চনপাঁড়া বস্তির মতো দেশের হাজারো কুখ্যাত মাদকের স্পষ্ট গুলোর মাদক ব্যবসা কি চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে? কক্সবাজার ও অন্যান্য সীমান্ত দিয়ে মাদকের ভয়ঙ্কর সরবরাহ রুটগুলো কি বন্ধ করা গেছে? মাদক কারবারিদের পাচার করা অবৈধ অর্থের গোপন উৎস কি উন্মোচিত হয়েছে? পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি এখন থেকে দেশের প্রতিটি মাদক স্পটে নিয়মিত, কঠোর ও দৃশ্যমান নজরদারি বজায় রাখবে? 

সর্বোপরি, বিপথগামী মাদকাসক্ত তরুণদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত বাজেট ও সুযোগ-সুবিধা কি বাড়ানো হয়েছে? এই মৌলিক ও জ্বলন্ত প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর না দিয়ে কেবল একজন তরুণ জনপ্রতিনিধির অস্ত্র প্রদর্শন বা পদত্যাগ নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ করা মানে মূল সমস্যার গভীরতাকে আড়াল করে ফেলা।

সবচেয়ে গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, যখন একজন তরুণ সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধি নিজের চোখের সামনে নিজ এলাকার যুবসমাজ ও সামাজিক পরিবেশের এই ভয়াবহ অবক্ষয় দেখতে পান এবং প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ শুনতে শুনতে চরম হতাশায় শেষ পর্যন্ত নিজেই মাঠে নামতে বাধ্য হন, তখন তার ভুলত্রুটির সমালচনার পাশাপাশি আমাদের এই প্রশ্নটিও খুব জোরালোভাবে তুলতে হবে যে এমন একটি অস্বাভাবিক ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন? ইশরাকের কাজের পদ্ধতি নিয়ে সুস্থ সমালোচনা হতেই পারে, প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী তদন্ত হোক এবং তার কোনো ভুল প্রমাণিত হলে তার বিচারও হোক কিন্তু তার এই প্রতিবাদের অন্তর্নিহিত ক্ষোভ মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সেটিকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখা বা মুছে ফেলা যাবে না।

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী রাজপথের আন্দোলন ও লড়াই সংগ্রাম থেকে উঠে আসা তরুণ রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তারা যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েও পূর্বের মতোই প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একই পুরোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তবে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তুলবে তাহলে এত রক্তের বিনিময়ে এই পরিবর্তনের অর্থ কী হলো? 

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাক্টনের বিখ্যাত সেই ঐতিহাসিক উক্তিটি আমাদের চিরস্মরণীয় ‘ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মানুষকে পুরোপুরি দুর্নীতিগ্রস্ত করে।’ সরকার বদল হলেই রাতারাতি রাষ্ট্র বদলে যায় না। রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে তখনই বদলায়, যখন প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হয় পুলিশ বাহিনী রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে পুরোপুরি পেশাদার হয়, অপরাধীর কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা হয় এবং সাধারণ মানুষ পুনরায় বিচার বিভাগের ওপর পূর্ণ আস্থা ফিরে পায়। 

আজ বাংলাদেশের সামনে তাই ব্যক্তি ইশরাক হোসেন নন, সবচেয়ে বড় এবং প্রধান প্রশ্ন হলো স্বয়ং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা। একজন ইশরাককে পদত্যাগ করানো হয়তো রাজনৈতিক কৌশলের বিচারে সহজ কিন্তু দেশজুড়ে শিকড় গেড়ে বসা একেকটি দুর্ভেদ্য মাদক সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলা অত্যন্ত কঠিন। একজন সংসদ সদস্যের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে কি না তা নিয়ে দিনভর টেলিভিশন টকশো বা বাহাস করা সহজ কিন্তু একজন জনপ্রতিনিধির কেন নিজের সুরক্ষায় অস্ত্র হাতে নামার চরম প্রয়োজন তৈরি হলো তার সৎ উত্তর দেওয়া কঠিন। একটি ভিডিওর কয়েক মিনিটের অংশবিশেষ নিয়ে কাটাছেঁড়া করা সহজ কিন্তু গত দুই দশক ধরে তলে তলে গড়ে ওঠা মাদকের বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

তবু রাষ্ট্রকে তার সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে এই কঠিন কাজটিই করে দেখাতে হবে। মাদকবিরোধী এই দীর্ঘ লড়াইকে কোনোভাবেই সস্তা রাজনৈতিক প্রচারণা, মিডিয়া ট্রায়াল কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক কাদা ছোড়াছুড়িতে পর্যবসিত না করে এটিকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের জনগণের সামনে একদম পরিষ্কার করতে হবে মাদকের বিশাল চালানগুলো কোন কোন রুট দিয়ে দেশে ঢোকে, এর নেপথ্যে কোন কোন রাঘববোয়াল পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং তাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সুনির্দিষ্ট কী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে যাবতীয় রাজনৈতিক বলয় ও প্রভাবমুক্ত করে তাদের প্রয়োজনীয় পেশাদার সক্ষমতা দিতে হবে। সংসদ সদস্যদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে নয়, বরং তাদের হাতে কাঠামোগত জবাবদিহির শক্তিশালী সাংবিধানিক ক্ষমতা দিয়েই মাদক নির্মূলের পথ সুগম করতে হবে।

রাষ্ট্র যদি তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে বারবার ব্যর্থ হয়, তবে অসহায় ও ক্ষুব্ধ জনগণ একসময় নিজ হাতে আইন তুলে নিতে বাধ্য হবে। আর জনগণ যখন নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, তখন আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই চরমভাবে বিপন্ন ও দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিসংখ্যানের পাতায় মব জাস্টিসে ঘটে যাওয়া ১৭১ বা ১৮৭ জনের মৃত্যু কেবল কতগুলো মৃতদেহের হিসাব নয় এগুলো মূলত রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া আস্থার নিখাদ সংকেত। রাজনৈতিক সহিংসতার ৭৩টি মৃত্যু কিংবা হাজার হাজার আহত মানুষের আর্তনাদ কেবল দলীয় কোন্দলের হিসাব নয় এগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মেক্সিকো বা কলম্বিয়ার মতো ব্যর্থ রাষ্ট্র বা মাদক সাম্রাজ্যের আতঙ্ক ছড়ানো কোনো কাজের কথা নয় কিন্তু মাদক, অবৈধ হুন্ডি ও কালোটাকা, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং দুর্বল বিচার ব্যবস্থার চক্র যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো সচেতন নাগরিকের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আজই কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

ইশরাক হোসেনের হাতে বৈধ অস্ত্র থাকা বা না থাকা নিয়ে সুস্থ বিতর্ক হতে পারে, এমনকি সেটি হওয়া উচিতও বটে। কিন্তু সেই বাহাস যেন আমাদের দেশের মাদকবিরোধী মূল ও প্রধান লড়াইটিকে হত্যা না করে। ইশরাকের উদ্দেশ্য যদি সত্যিই একটি মাদকমুক্ত ও সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ করা হয়ে থাকে, তবে তার এই ব্যক্তিগত প্রতিবাদের ক্ষোভকে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। তার কোনো ভুল বা আইন লঙ্ঘন হয়ে থাকলে প্রচলিত আইনেই তার সুরাহা হোক আর একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে তাদেরও কঠোর জবাবদিহির মুখোমুখি করা হোক। 

কারণ মাদকের বিরুদ্ধে এই জীবন-মরণ যুদ্ধ কোনো একক ব্যক্তি ইসরাকের নয় এমনকি কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল কিংবা বর্তমান সরকারের একার কোনো লড়াই নয়। এটি আমাদের পুরো জাতির এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার একমাত্র যুদ্ধ। এই মহাসংগ্রামে রাষ্ট্রকে অস্ত্রের মহড়া বা ফাঁকা বুলির প্রদর্শন না দেখিয়ে আইনের অদম্য ও নিরপেক্ষ শক্তি দেখাতে হবে; কেবল রাজনৈতিক সভার বাগ্মিতা নয় মাঠের বাস্তব ও স্থায়ী ফলাফল দেখাতে হবে কয়েক ঘণ্টার লোক দেখানো অভিযান নয়, বছরের পর বছর ধরে চলা একটি ধারাবাহিক ও অদম্য রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। 

এ দেশের সাধারণ মানুষ আর কোনো ফাঁকা বুলি বা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি শুনতে চায় না। তারা নিজ চোখে দেখতে চায় মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হয়েছে, গডফাদার বা মূল হোতারা হাতকড়া পরে আদালতের মুখোমুখি হয়েছে, তাদের অবৈধ আয়ের সমস্ত উৎস চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে, সীমান্ত পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়েছে, পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে তার অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে, প্রশাসন অপরাধীদের দেখে ভয় পাচ্ছে না এবং অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তার কোনো ধরনের রাজনৈতিক আশ্রয় বা প্রশ্রয় মিলছে না। 

এই ন্যূনতম আস্থার নিশ্চয়তা যদি রাষ্ট্র দিতে ব্যর্থ হয় তবে কেবল একজন ইশরাকের পদত্যাগ করিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামোগত ব্যর্থতা কখনো ঢাকা দেওয়া যাবে না। বরং এই প্রশ্নটি আরও অনেক বেশি জোরালোভাবে বারবার ফিরে আসবে মাদকের বিরুদ্ধে এই ভয়ঙ্কর লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ইশরাক কোথায় ছিলেন, সেটি মুখ্য নয় মূল প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র সেদিন কোথায় ছিল?

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close