আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেশে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক নিয়োগ ও আইন প্রয়োগে দুর্বলতাকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এসব বিষয়ে খোলা কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পত্রিকাটির নিজস্ব প্রতিবেদক শিপার মাহমুদ।
খোলা কাগজ : প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অব্যাহত থাকার প্রধান কারণ কী?
সাইদুর রহমান : প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অব্যাহত থাকার প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনারোধে সমন্বিত টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ না করা। সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নামে শুধু কমিটি গঠন এবং সুপারিশমালা তৈরির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের কোনো শাস্তি হয় না। এটাই দুর্ঘটনা অব্যাহত থাকার প্রধান কারণ। গত ৫-১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনার হার ঊর্ধ্বমুখী। এ হার অব্যাহত থাকলে মানবসম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হবে। যদিও যেখানে জীবনের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে একটি সংখ্যায় অনেক বড়। এখানে নিহত-আহতের সংখ্যা কম-বেশি কোনো বিষয় নয়।
খোলা কাগজ : সড়ক, রেল ও নৌ-পথে প্রতিবছর দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির চিত্র কেমন?
সাইদুর রহমান : সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির চিত্র উদ্বেগজনক। রেলপথে তিন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। এক. রেলগাড়ি লাইনচ্যুত হচ্ছে, দুই. রেল ট্র্যাকে হাঁটতে যেয়ে বা ভুল করে রেলগাড়িতে কাটা পড়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। তিন. রেলক্রসিংয়ে গেট কিপার না থাকা বা দায়িত্বে অবহেলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। রেলক্রসিং দুর্ঘটনা ভয়াবহভাবে ঘটছে। অনেক মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। দেশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ৮২% রেলক্রসিং ঝুঁকিপূর্ণ। নৌ-পথের দুর্ঘটনা তুলনামূলক কম। বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় ট্রলার ও নৌকা ডুবে মাঝে-মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে। দেশের বিভিন্ন নদীতে নৌকাডুবির ঘটনাও ঘটছে।
খোলা কাগজ : সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যানের পার্থক্য কেন দেখা যায়?
সাইদুর রহমান : সরকারি এবং বেসরকারি উভয় সংস্থা-ই গণমাধ্যম থেকে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে। অর্থাৎ উভয়ের তথ্যই সেকেন্ডারি। এখানে যত বেশি গণমাধ্যম ব্যবহার করা হয় তত বেশি সংখ্যা বাড়ে। যদিও সড়ক দুর্ঘটনার সব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। প্রাণহানি বা একাধিক ব্যক্তি মারাত্মক আহত না হলে তা গণমাধ্যমে আসে না। আবার দুর্ঘটনার পরে হাসপাতালে মারা যাওয়ার তথ্য গণমাধ্যমে আসে না। বেসরকারি সংস্থা হিসেবে আমরা অধিক গণমাধ্যম ব্যবহার করি এবং হাসপাতালে মৃত্যুবরণকারীদের কিছু তথ্য সংগ্রহ করি। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সংখ্যাগত পার্থক্য হয়। এ তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আছে। কখনো কখনো একই তথ্য রিপিট হয়। তথ্য ক্রস চেক করা এবং অধিকাংশ দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা চ্যালেঞ্জিং।
খোলা কাগজ : সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকের ভুল কতটা দায়ী?
সাইদুর রহমান : সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অবশ্যই চালকের দোষ ও দায় আছে। তবে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রথম কারণ ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি। এ ব্যবস্থাপনার মধ্যে রয়েছে— চালকের নিয়োগ, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্টকরণ, স্বাস্থসেবা ইত্যাদি। এরপর রয়েছে মোটরযানের অবস্থা। মোটরযান মেয়াদোত্তীর্ণ কিনা? ফিটনেস আছে কিনা? তৃতীয় কারণ চালক। চালকের মেজাজ, মানসিকতা, স্বাস্থ্যগত অবস্থা। যদি ব্যবস্থাপনা ও মোটরযান ঠিক থাকে তাহলে দুর্ঘটনার মাত্রা খুই কম হয়। তবে চালকের কারণেও কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু ঢালাওভাবে সব দায় চালকের নয়।
খোলা কাগজ : ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক নিয়োগের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না কেন?
সাইদুর রহমান : সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাকারী প্রাতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি আছে। এজন্য ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক নিয়োগের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার করে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
খোলা কাগজ : মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে কী ধরনের পদক্ষেপ জরুরি?
সাইদুর রহমান : মানসম্মত হেলমেট দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঝুকি ৪৮% হ্রাস করে। মানস্মত হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাইকের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মোটরসাইকেলে স্পিড গভর্নর প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। দেশে মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল। এই মোটরসাইকেলের একটি বিরাট অংশ কিশোর-তরুণদের হাতে। এরা বেপরোয়া বাইক চালিয়ে নিজেরা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং অন্যদের আক্রান্ত করছে। তাই বাইক চালনার ক্ষেত্রে কঠোর আইন প্রয়োগের সঙ্গে ব্যাপকভাবে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
খোলা কাগজ : ঢাকা শহরে ট্রাফিকব্যবস্থায় এআই ক্যামেরার উদ্যোগ কতটা কার্যকর?
সাইদুর রহমান : প্রযুক্তিগত নজরদারীর মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা খুবই কার্যকর। এ ক্ষেত্রে এআই ক্যামেরার ব্যবহার সরকারের একটি যুযোপযোগী সিদ্ধান্ত। এ ক্যামেরা ব্যবহারের মাধ্যমে যথেষ্ট ভালো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে।
খোলা কাগজ : দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানি কমাতে জরুরি সেবায় কী পরিবর্তন প্রয়োজন?
সাইদুর রহমান : দেশে দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত উদ্ধার, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং হাসপাতালে নেওয়ার সক্ষমতা খুবই অপ্রতুল। এজন্যই মহাসড়কে পাশে ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কয়েকটি নির্মাণ করা হলেও এখনো চালু হয়নি। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সরকার অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করেছে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার এবং জরুরি চিকিসার জন্য ছাত্র-যুবক ও গ্রাম্য ডাক্তারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা যেতে পরে। দুর্ঘটনার পর গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে পারলে মৃত্যুহার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে সরকারেকে মনোযোগী হতে হবে।
কেকে/সাশ