‘ছেলেকে কোনো দিন বিচারকের আসনেই দেখতে চাই’—পটিয়া চৌকি আদালতের সেরেস্তাদার নিজামুল হকের দীর্ঘদিনের সুপ্ত বাসনা ছিল এটি। বাবার সেই স্বপ্নই আলোর দিশারি হয়ে দাঁড়িয়েছিল তরুণ রেজাওনুল ইসলাম গণির জীবনে। নিজের অদম্য মেধা, মায়ের শাসন-ভালোবাসা আর বাবার তীব্র ইচ্ছাশক্তির অনুপ্রেরণায় একের পর এক সাফল্যের ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছালেন তিনি।
১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ১০৪তম স্থান অর্জন করে চূড়ান্তভাবে সিভিল জজ (সহকারী জজ) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার এই কৃতী সন্তান।
রেজাওনুলের এই গৌরবময় অর্জনে বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের প্রেমাশিয়া গ্রামের মৌলভীপাড়ায় এখন আনন্দের জোয়ার বইছে। গ্রামের ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ; স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী মিষ্টি মুখ করিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করছেন।
ছোটবেলায় গ্রামে চিকিৎসাসেবার অভাব দেখে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন রেজাওনুল। তবে এসএসসি পরীক্ষার সময় এক দুর্ঘটনার কারণে প্রত্যাশার চেয়ে কম জিপিএ পাওয়ায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েন। ২০১৮ সালে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ২৬৫ নম্বরের মধ্যে ২৬৩ পেয়েও সরকারি মেডিকেলে পড়ার সুযোগ হয়নি, আর বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি করানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না পরিবারের।
তবে সেখানে থেমে যাননি তিনি। নগরের বাকলিয়া সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে নামেন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিযুদ্ধে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানসহ প্রায় সব কটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা তালিকায় স্থান পান। তবে সব পথ পেছনে ফেলে বাবার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে ভর্তি হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে, যেখানে ভর্তি পরীক্ষায় তাঁর অবস্থান ছিল ১৮তম।
আইন বিভাগে এসে রেজাওনুল একের পর এক সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম—উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। শিক্ষাজীবনে অসামান্য ফলাফলের স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেন ডিনস অ্যাওয়ার্ড, ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড ও ইউজিসি ফেলোশিপ। পরে তিনি ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’-এর জন্যও মনোনীত হন। বর্তমানে রাষ্ট্রপতি পদক গ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
স্নাতক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অর্জন করেন সারা দেশে প্রথম স্থান। কিন্তু অসামান্য এই রাষ্ট্রীয় অর্জনের পরও বাবার মন ভরেনি।
স্মৃতিচারণ করে রেজাওনুল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হলাম, তখন আব্বু-আম্মুকে ফোন করে খুশির খবর জানাই। কিন্তু আব্বু বললেন, “যেদিন জুডিশিয়ারি হবি, সেদিন খুশি হব।” এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে সারা দেশে প্রথম হওয়ার পর বহু মানুষ অভিনন্দন জানালেও বাবা বলেছিলেন, “এটা না, তোকে জুডিশিয়ারি হতে হবে।”’
বাবার সেই লক্ষ্যকেই নিজের মূল স্বপ্ন হিসেবে ধরে নেন রেজাওনুল। ১৭তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিভিল জজ হন তার বন্ধু রোবায়েত। বন্ধুর এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি মানিব্যাগে রেখে সেটির পেছনে রেজাওনুল লিখে রেখেছিলেন—‘১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হব।’
এছাড়া রেজাওনুলের পথচলায় অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর নানা (মায়ের আপন মামা) সাবেক জেলা ও দায়রা জজ একেএম ফজলুল করিম। শৈশব থেকে নানার সততা ও সুনামের গল্প শুনে বড় হওয়া রেজাওনুলকে বিচারক হওয়ার মানসিক প্রস্তুতিতে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল।
পটিয়া চৌকি আদালতের সেরেস্তাদার হিসেবে নিজামুল হক (৫৫) প্রতিদিন বিচারকদের আদেশ দেওয়া এবং আইনজীবীদের সওয়াল-জবাব খুব কাছ থেকে দেখতেন। সেখান থেকেই তার সুপ্ত বাসনা জাগে—নিজের সন্তানও একদিন দেশের বিচারপীঠের আসনে বসবে।
ছেলের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার খবর শুনে আবেগাপ্লুত নিজামুল হক বলেন, ‘আমি আদালতের খুব সাধারণ কর্মী। কিন্তু স্বপ্ন দেখতাম আমার ছেলে একদিন বিচারকের আসনে বসে ন্যায়বিচার করবে। আজ আল্লাহর অশেষ রহমতে সেই স্বপ্ন পূরণ হলো।’
ছেলের সাফল্যের নেপথ্যে মায়ের অপরিসীম ত্যাগ ও প্রার্থনার কথা স্মরণ করে মা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘ছেলেকে নিয়ে বাবা যে স্বপ্ন দেখতেন, তা সফল করার জন্য রাত জেগেছে আমার সন্তান। আমি কেবল মা হিসেবে ওর পাশে থেকে যত্ন নিয়েছি আর দোয়া করেছি। আজ সন্তানকে আল্লাহ এই মর্যাদায় বসিয়েছেন, মা হিসেবে এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু হতে পারে না।’
নিজের অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ব্যক্ত করতে গিয়ে নতুন সিভিল জজ রেজাওনুল ইসলাম গণি বলেন, ‘অদম্য চেষ্টা, ভাগ্য এবং বাবা-মায়ের দোয়াই আমাকে সাফল্যের এই পথ দেখিয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত অধ্যবসায় তো ছিলই।’
বিচারিক জীবনের দায়িত্ব ও পরকালের জবাবদিহি স্মরণ করে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে যোগ করেন, ‘এখন আমার প্রধান দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাআলা যে সাত ধরনের ব্যক্তিকে তাঁর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন, তাদের অন্যতম হলেন ন্যায়বিচারক। সেই বিশ্বাস ও নিষ্ঠাকে বুকে ধারণ করেই আমি দেশ ও জনগণের সেবা করতে চাই।’
মৌলভীপাড়ার সাধারণ এক মেধাবী তরুণ থেকে দেশের বিচার বিভাগের বিচারক হওয়ার রেজাওনুল ইসলাম গণির এই রূপান্তর বাঁশখালীসহ পুরো চট্টগ্রামের তরুণদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করেন তার এলাকার ঘনিষ্ঠজন মোহাম্মদ ওয়াসিম।
কেকে/এমএ