কক্সবাজারের পেচারদ্বীপ সমুদ্রসৈকতে নেমে নিখোঁজ আরও এক পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারজনে। এখনও নিখোঁজ রয়েছে আরও এক পর্যটক।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল ১০টায় পেচারদ্বীপ সৈকতে ভেসে আসে মরদেহটি। প্রাথমিকভাবে মরদেহ নিখোঁজ চট্টগ্রামের বাংলাবাজার বায়েজিদ এলাকার হারুনের বলে জানিয়েছে স্বজনরা।
নিহত চারজনের মধ্যে রোহান ও জিশান ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা। আর আকাশ ও হারুন চট্টগ্রামের বাংলাবাজার বায়েজিদ এলাকার বাসিন্দা। এখনও ঢাকার উত্তরার নিবিড় নিখোঁজ রয়েছেন।
কক্সবাজার ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য বলেন, ‘বুধবার বিকাল পাঁচটার দিকে নির্জন পেচারদ্বীপ সৈকতে চট্টগ্রাম থেকে আসা পাঁচ পর্যটক এবং ঢাকা থেকে আসা সাত পর্যটক পানিতে ছিলেন। তাদের একজন সমুদ্রে ভেসে যেতে থাকলে বাঁচার জন্য চিৎকার করেন। তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন অন্যরা। একপর্যায়ে তারা পরস্পরের হাত ধরে শিকলের মতো তৈরি করে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু হঠাৎ বড় ঢেউ আছড়ে পড়লে তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ঢেউয়ের তোড়ে কয়েকজন একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পানিতে তলিয়ে যান। পরে ঘন্টাখানেক পর স্থানীয় জেলে, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। নিখোঁজ রয়ে যায় দুইজন।
দোলন আচার্য্য আরও বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় পেচারদ্বীপ সৈকতে একটি মরদেহ ভেসে আসে। পরে সেটি উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজদের স্বজনরা জানিয়েছে এটি চট্টগ্রামের বাংলাবাজার বায়েজিদ এলাকার হারুনের মরদেহ। মরদেহটি উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।’
নিহত রোহানের খালু মো. জাহিদ বলেন, ‘তারা সমুদ্রে গোসল করতে নেমেছিলেন। তাদের থেকে কিছুটা দূরে থাকা এক পর্যটক পানিতে ভেসে যাওয়ার সময় ‘হেল্প, হেল্প’ বলে চিৎকার করছিলেন। তখন তার চার-পাঁচজন বন্ধু তাকে উদ্ধারে এগিয়ে যান। তারা একে অপরের হাত ধরে শিকলের মতো তৈরি করে তাকে টেনে আনার চেষ্টা করেন।’
জাহিদ বলেন, ‘উদ্ধারের চেষ্টা চলার সময় হঠাৎ বড় একটি ঢেউ আছড়ে পড়ে। তখন তারা পানির নিচে পা রাখতে পারছিলেন না। ঢেউয়ের ধাক্কায় একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সবাই স্রোতে তলিয়ে যেতে থাকেন। পরে আশপাশের লোকজনের সহায়তায় কয়েকজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের সাতজনের একটি দল ছিল। এ দলের দুজন মারা গেছেন, আরেকজন এখনও নিখোঁজ। বাকিদের স্থানীয়রা উদ্ধার করে। তাদের কেউই ভালোভাবে সাঁতার জানতেন না। সমুদ্রে সাঁতার কাটা আর সাধারণ পানিতে সাঁতার কাটার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। হঠাৎ বড় ঢেউয়ের মুখে পড়লে আতঙ্কিত হয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের সাব-অফিসার মো. আবু জাফর বলেন, ‘সাঁতার জানেন না এমন ব্যক্তিদের তো বটেই, সাঁতার জানা ব্যক্তিদেরও বঙ্গোপসাগরের মতো উত্তাল সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।’
আবু জাফর বলেন, ‘পর্যটকদের তারা সাঁতার জানেন কি না, তা জানতে চেয়েছিলেন। তারা কেউই সাঁতার জানেন না বলে জানান। এরপর সাঁতার না জেনে এত বড় সমুদ্রে কেন নেমেছেন, জানতে চাইলে পর্যটকেরা তাকে বলেন, তারা যে রিসোর্টে উঠেছিলেন, সেখান থেকে জানানো হয়েছিল, সেখানে নামলে কোনো সমস্যা হবে না।’
রামুস্থ হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সোলাইমান বলেন, ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ি ও রামু থানার পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের একটি দল কাজ করছে। উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে।’
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘স্থানীয়দের নিষেধ সত্ত্বেও পর্যটকেরা ওই স্থানে পানিতে নামেন। একপর্যায়ে দুর্ঘটনা ঘটলে অন্য পর্যটকেরা তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যান। এ ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, দুজন নিখোঁজ রয়েছেন এবং একজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।’
ইউএনও আরও বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট রিসোর্টের মালিকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নিখোঁজ একজনকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট কাজ করছে। তাদের সঙ্গে জেলা পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরাও রয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রিসোর্টগুলোর নিয়মকানুন না মানা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তায় যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
কেকে/এআই