কাউন্টার কিংবা অনলাইনে মিলছে না ট্রেনের টিকিট। অথচ নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিতে রাজি হলেই টিকিট পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা রেলস্টেশন এলাকায় মো. মোখলেছ ভুইয়া নামের এক মুদিদোকানির বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। এর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির অভিযোগ উঠেছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে এলাকায় টিকিট কালোবাজারি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় এসআরবি-১৪, সিপিসি-২। ওই অভিযানে অনলাইন ও রেলওয়ের কাউন্টার থেকে অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করে মজুত এবং পরে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে মোখলেছ ভুইয়াকে আটক করা হয়েছিল বলে সে সময় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়। এরপর আইনি প্রক্রিয়া শেষে মুক্তি পেলেও তাঁর বিরুদ্ধে আবারও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
মোখলেছ ভুইয়া কটিয়াদী উপজেলার সহশ্রাম ধুলদিয়া ইউনিয়নের সহশ্রাম এলাকার কাজল ভুইয়ার ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে গচিহাটা রেলস্টেশন এলাকায় একটি মুদিদোকান পরিচালনা করছেন তিনি।
নতুন করে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে মোখলেছের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর এগারোসিন্ধুর প্রভাতী ও এগারোসিন্ধুর গোধূলি ট্রেনের পাঁচটি টিকিট চাওয়া হলে তিনি টিকিট আছে বলে জানান। প্রতিটি টিকিটের দাম ৪৫০ টাকা হিসাবে পাঁচটির জন্য মোট ২ হাজার ২৫০ টাকা দাবি করেন।
মোখলেছ জানান, বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠালে হোয়াটসঅ্যাপে টিকিট পাঠিয়ে দেবেন। পরে সরাসরি তাঁর সঙ্গে দেখা করে এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগটি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন তিনি। এ সময় টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাবও দেন বলে জানা গেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যাত্রীদের অভিযোগ, কাউন্টার ও অনলাইনে টিকিট না পেয়ে অনেকে বিকল্প উপায়ে টিকিট সংগ্রহের চেষ্টা করেন। এই সুযোগে কিছু ব্যক্তি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি টাকা নিয়ে টিকিট সরবরাহ করছেন। এতে জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করতে চাওয়া যাত্রীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চৌদ্দশত ইউনিয়নের নোয়ার গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, “ঢাকায় যাওয়ার জন্য কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট না পেয়ে মোখলেছ ভুইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি টিকিট রয়েছে বলে জানান এবং প্রতিটি টিকিটের দাম ৪৫০ টাকা দাবি করেন। জরুরি প্রয়োজন থাকায় বেশি টাকা দিয়ে টিকিট নিয়েছি।”
নিয়মিত রেলযাত্রী ও ব্যবসায়ী আল আমিন বলেন, “অনলাইনে টিকিট কাটতে গেলে অনেক সময় টিকিট পাওয়া যায় না। কাউন্টারেও দীর্ঘ অপেক্ষার পর খালি হাতে ফিরতে হয়। অথচ পরে পরিচিতদের মাধ্যমে বেশি টাকা দিলে টিকিট পাওয়া যায়।”
আরেক যাত্রী আলমগীর হোসেন বলেন, “জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় যাওয়ার দরকার হলে অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা দিয়ে টিকিট কেনেন। এতে সাধারণ যাত্রীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নির্ধারিত মূল্যে টিকিট পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।”
যাত্রীদের মতে, টিকিটের সংকটে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রোগী ও তাদের স্বজনদের। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদে অনেকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করেন। এ পরিস্থিতিতে টিকিট মজুত করে বেশি দামে বিক্রির সঙ্গে কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গচিহাটা রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার আরিফ বলেন, “আমি এসব কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত নই। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তাও বলি না। ইতিমধ্যে আমি মোখলেছ ভুইয়ার বিষয়ে অবগত হয়েছি। কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে জিআরপি থানাকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। আবারও জানাব।”
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাহাউদ্দিন ফারুকী বলেন, “মোখলেছের বিষয়টি আমরা ইতিপূর্বে বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি। তার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে, অভিযানও চলছে। মোখলেছ স্টেশনমাস্টারের কক্ষের পাশে রেলওয়ের একটি স্টল লিজ নিয়ে দোকান পরিচালনা করছেন। কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে সে বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ট্রেনের টিকিট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হলে সাধারণ যাত্রীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ও ভোগান্তি কমবে।
কেকে/সাশ