শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬,
৭ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ৪৩০ রানের পাহাড় গিলে ইংল্যান্ডকে কাঁদাল লঙ্কানরা      ● দাম্মাম ও রিয়াদগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট স্থগিত       ● পিএইচপির ত্রুটির পর হ্যাকিংয়ের চেষ্টা কয়েক লাখ ছাড়াল      ● প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে কূটনীতিতে নতুন মোড়      ● ডেঙ্গুতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৫১২      ● সাজেকে অবরোধকারীদের হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ৯ সদস্য আহত      ● সাজেকে ইউপিডিএফ ৩০-৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে : আইএসপিআর      
দেশজুড়ে
বৃষ্টিতে ভিজত কোরআন, ৭২ ঘণ্টায় লায়লার ঘরের স্বপ্ন পূরণ
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৪ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

জরাজীর্ণ ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ত। ভিজে যেত কোরআন শরিফও। স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তিন নাতিকে নিয়ে অসহায় জীবন কাটাচ্ছিলেন ৭০ বছর বয়সী বিধবা লায়লা বেগম। সামনে শীত, বাড়ছিল দুর্ভোগের শঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন ‘ভয়েস অব পাকুন্দিয়া’র ক্রিয়েটর ও অ্যাডমিন এস এম রায়হান। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মাত্র ৭২ ঘণ্টায় দেশে-বিদেশে থাকা মানুষের কাছ থেকে অনুদান এসেছে ৯০ হাজার ১১৫ টাকা। সেই অর্থে নির্মাণ করা হচ্ছে লায়লার নতুন ঘর।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ১১টায় কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পোড়াবাড়ীয়া পশ্চিমপাড়া এলাকায় স্থানীয়দের উপস্থিতিতে ঘর নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লায়লা বেগমের স্বামী নেহাজ উদ্দিন মারা গেছেন প্রায় ১০ বছর আগে। কয়েক মাস আগে মারা যান তাঁর একমাত্র ছেলে ফারুক। এরপর তিন নাতিকে নিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় পড়েন তিনি। তার থাকার ঘরটি ছিল অত্যন্ত জরাজীর্ণ। বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ত। এমনকি ভিজে যেত তার কোরআন শরিফও। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিজের উদ্যোগে ঘরটি মেরামত বা নতুন ঘর নির্মাণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

লায়লার এমন দুরবস্থার কথা জানতে পেরে তার জন্য একটি নিরাপদ ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেন এস এম রায়হান। গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি মানবিক আবেদন জানিয়ে তিনি লায়লার কষ্টের কথা তুলে ধরেন এবং ঘর নির্মাণে সবার সহযোগিতা কামনা করেন। তার সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশে-বিদেশে থাকা মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দারা অনুদান পাঠাতে শুরু করেন। মাত্র ৭২ ঘণ্টায় জমা হয় ৯০ হাজার ১১৫ টাকা।

এস এম রায়হান বলেন, “একদিন হঠাৎ মাসুম ও প্রবাসে থাকা রাসেল আমাকে ফোন করে জানান, তাদের এলাকায় লায়লা নামে একজন বৃদ্ধা নারী রয়েছেন। তার স্বামী প্রায় ১০ বছর আগে মারা গেছেন। একমাত্র ছেলে ফারুকও কয়েক দিন আগে মারা গেছেন। বর্তমানে তাঁর থাকার ঘরটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। সামনে শীত আসছে, তখন ঘরের চারপাশ দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকে তাঁর কষ্ট আরও বাড়বে। বিষয়টি জানার পর তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেছিলাম, ঘরটি নির্মাণের জন্য চেষ্টা করব।”

তিনি আরও বলেন, “সামাজিক কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হয়েছি। সে কারণে শুরুতে কিছুটা দ্বিধা ছিল। কিন্তু পরে যখন ঘরটির করুণ অবস্থা দেখলাম, তখন আর বসে থাকতে পারিনি। গত সোমবার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করি। এরপর দেশে-বিদেশে থাকা মানুষ ও এলাকাবাসী যেভাবে সাড়া দিয়েছেন, তাতে আমি অভিভূত। মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা ছাড়া তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার নেই।”

লায়লার দুরবস্থার বর্ণনা দিয়ে রায়হান বলেন, “লায়লা একজন ধার্মিক নারী। তিনি নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করেন এবং তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন। বৃষ্টির পানি পড়ার কারণে তাঁর কোরআন শরিফও ভিজে যেত। এমন একজন অসহায় মানুষের জন্য একটি নিরাপদ ঘর তৈরি করে দিতে পারা আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।”

অনুদানের অর্থের হিসাব প্রকাশের বিষয়ে তিনি বলেন, “সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় আমরা ঘরটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের কাছে ৯০ হাজার ১১৫ টাকা সহযোগিতা এসেছে। ঘরের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে লায়লার হাতে বুঝিয়ে দেওয়ার পর কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব সবার সামনে তুলে ধরব। যাঁরা অর্থ ও সহযোগিতা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। মহান আল্লাহ যেন তাঁদের এই সহযোগিতার উত্তম প্রতিদান দেন।”

নতুন ঘর নির্মাণের খবরে আবেগাপ্লুত লায়লা বেগম। নিজের দুর্ভোগের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “ঘরের মধ্যে খুবই কষ্ট। আমার কোরআন শরিফ ভিজে থাকত। আমি কোরআন শরিফ বুকে নিয়ে ঘুমাতাম। সকালে নামাজ পড়ে কোরআন পড়ি, আবার রাত ১২টার দিকেও পড়ি। আমার ঘরের যে এত কষ্ট, তা বলার মতো নয়।”

নতুন ঘর নির্মাণের উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম, আল্লাহ যেন আমার জন্য এমন একটা ব্যবস্থা করে দেন। আল্লাহ হঠাৎ আমার জন্য এই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এখন ঘর হচ্ছে, এতে আমি খুব খুশি। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া।”

যাঁরা ঘর নির্মাণে সহযোগিতা করছেন, তাদের জন্য দোয়া করার কথা জানিয়ে লায়লা বলেন, “আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, কোরআন পড়ি। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া চাইব। যাঁরা এই ঘরের কাজে শরিক হয়েছেন, তাঁদের সবার জন্য দোয়া করব।”

লায়লার প্রতিবেশী আসাদ বলেন, “লায়লার স্বামী মারা গেছেন প্রায় ১০ বছর আগে। তাঁর একমাত্র ছেলেও মারা গেছেন। বর্তমানে তিনি খুবই অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। থাকার ঘরটি ছিল অত্যন্ত জরাজীর্ণ। বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ত। তাঁর আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে এই ঘরটিই তাঁর একমাত্র সম্বল। আমরা প্রতিবেশীরা মাঝেমধ্যে তাঁকে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। তবে তাঁর জন্য একটি ভালো ঘর তৈরি করে দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। রায়হানসহ যাঁরা এগিয়ে এসে তাঁর ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।”

ডেন্টাল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন টিটু বলেন, “শুক্রবার এমন একটি মহৎ কাজে অংশ নিতে পেরে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। প্রায় ৭০ বছর বয়সী একজন বিধবা নারীকে একটি সুন্দর ঘর উপহার দিতে পারা আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। আমরা জেনেছি, তিনি অত্যন্ত ধার্মিক এবং নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগি ও কোরআন তিলাওয়াত করেন। আগে তিনি একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করতেন। সেখানে বৃষ্টি হলে পানি পড়ত, ফলে তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও ইবাদত-বন্দেগি করাও কষ্টকর ছিল। নতুন ঘরটি পাওয়ায় তিনি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারবেন বলে আশা করছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা যারা সুস্থ ও সচ্ছল আছি, তা মহান আল্লাহর দান। তাই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা যেন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক কাজ করতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের এই মানসিকতা অটুট রাখুন এবং সব সময় অসহায় মানুষের সেবা করার তৌফিক দান করুন।”

মো. জহিরুল ইসলাম ভাবন বলেন, “স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করা শুধু সরকারের একার পক্ষে সব সময় সম্ভব নয়। বিশেষ করে সমাজের একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে সব ধরনের সহায়তা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সরকারের পাশাপাশি আমাদের মতো সাধারণ ও সামর্থ্যবান মানুষেরও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই আমি ব্যক্তিগতভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখব, ইনশাআল্লাহ।”


কেকে/সাশ 


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close