জর্ডানের একটি গির্জায় শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে বন্দুকধারীদের গুলিতে সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৪০ জন।
শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির কারাক গভর্নরেটের হামুদ গির্জায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষ একে উগ্রপন্থীদের সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
জর্ডানের জননিরাপত্তা অধিদপ্তরের প্রধান মেজর জেনারেল আবদুল্লাহ আল-মায়েতাহ এক সংবাদ সম্মেলনে হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, হামলায় আহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই চিকিৎসাধীন রয়েছে। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রীও এ ঘটনায় ৪০ জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন।
জর্ডানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিন আল-ফারায়েহ বলেন, উগ্রপন্থীরা এ হামলা চালিয়েছে। তবে হামলাকারীদের সঙ্গে জর্ডান কিংবা দেশের বাইরের কোনো পরিচিত গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার সময় এখনো আসেনি।
তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল দেশ জর্ডানে এ ধরনের হামলা বিরল। তবে দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামপন্থী জঙ্গিদের বেশ কয়েকটি হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করা হয়েছে। এবারের হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন স্বীকার করেনি।
দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল আল-মামলাকা প্রকাশিত একটি ভিডিওতে গির্জার বাইরে ফুটপাত থেকে তিন ব্যক্তিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। এ সময় তারা গাছ ও নিচু দেয়ালের আড়ালে অবস্থান নেন। পরে তাদের গির্জার প্রবেশপথের দিকে দৌড়ে যেতে দেখা যায়। ভিডিওটির দৃশ্য এবং গির্জার প্রবেশপথ ও আশপাশের দেয়ালের সঙ্গে মিলিয়ে এর সত্যতা যাচাই করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী জাফর হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, সন্ত্রাসী মতাদর্শ ও অন্ধ উগ্রবাদ থেকেই এ ধরনের হামলার জন্ম। সমাজকে এ পথে এগোতে দেওয়া হবে না।
হামলার সময় শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খালেদ বুরকান। আল-মামলাকাকে তিনি জানান, সেখানে কয়েক ডজন মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বন্দুকধারীরা কয়েক মিনিট ধরে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ইহাব আম্মারিন জানান, হামলার পর তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় অনেককে মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে দেখেছেন। ঘটনাস্থলে মানুষের কান্না, আহাজারি ও চিৎকারে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল বলেও জানান তিনি।
হামলার পর কারাকে বাদশাহ আবদুল্লাহ
হামলার কয়েক ঘণ্টা পর জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ কারাক এলাকা পরিদর্শন করেন। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে লৌহকঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক বিবৃতিতে বাদশাহ বলেন, কারাকে সন্ত্রাসী হামলার জবাব অত্যন্ত কঠোরভাবে দেওয়া হবে। গুলি চালিয়ে জর্ডানের জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা যারা করছে, জাতীয় ঐক্যের সামনে তাদের কোনো সুযোগ নেই।
রয়টার্সের ধারণ করা হামলার পরবর্তী দৃশ্যে গির্জার প্রবেশপথের কাছে মেঝেতে রক্তের দাগ দেখা যায়। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরও মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষ ও উপাসনালয়ে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে আহতদের সহায়তা করতে কারাকের একটি সরকারি হাসপাতালের সামনে জড়ো হন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মধ্যে হানি আল-মুবায়দিন নামের এক ব্যক্তি বলেন, এ ঘটনার পর মানুষ যেন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। তবে রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের একমাত্র প্রত্যাশা, উগ্রবাদী চিন্তার উৎস কোথায় এবং কীভাবে এসব ধারণা তরুণদের মনে ছড়িয়ে পড়ছে, তা তদন্ত করে বের করা।
জর্ডানের জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের। দেশটিতে খ্রিষ্টধর্মের ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তীর্থযাত্রীরা আসেন।
জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজও এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি এক্সে দেওয়া পোস্টে ঘটনাটিকে উপাসনালয়ে চালানো নৃশংস ও জঘন্য হামলা হিসেবে উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া দেশগুলোর মধ্যে জর্ডানও ছিল। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে উগ্রপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে কাজ করছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ