কোনোভাবেই যেন থামানো যাচ্ছে না অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রা। উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত অনেক দেশ থেকে প্রতি বছর হাজারো মানুষ ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। এর একটি বড় অংশ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু চিন্তা না করেই ছুটে যান অজানার উদ্দেশে। এর ফলে একদিকে অনেক জীবন ঝরে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল শুক্রবারও (২৩ অক্টোবর) ইউরোপের তিন দেশ থেকে ৩৫ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ইতালি থেকে ১৯ জন, গ্রিস থেকে ১০ জন এবং সাইপ্রাস থেকে ৬ জন রয়েছেন। একটি বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। এ ছাড়াও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওপি) চুক্তির আওতায় এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন।
জানা গেছে- ইউরোপ থেকে অনিয়মিতভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ফেরত আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওপি) চুক্তি হয়। এর আওতায় এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফিরেছেন সাইপ্রাস, ইতালি, রোমানিয়া ও ফ্রান্স থেকে।
থামছে না অবৈধ পথে ইউরোপ-যাত্রা
অবৈধ পথে এই ইউরোপে যেতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মাঝে-মধ্যেই প্রাণহানি ঘটছে বাংলাদেশিদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় বেপরোয়া মানবপাচারকারীরা। অবৈধপথে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর এমন ঘটনা ঘটছে মাঝে-মধ্যেই।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, মনিটরিং না থাকায় বাংলাদেশিদেরই টার্গেট করছে মানবপাচারকারীরা। লিবিয়ায় বাংলাদেশ থেকে মানবপাচারে রুট ব্যবহার হয়ে থাকে। মূল রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে আবুধাবি এবং দুবাই। ভিজিট ভিসার ক্ষেত্রে মনিটরিং না থাকায় পাচারকারীরা টার্গেট করছে বাংলাদেশিদের।
সূত্র আরও বলছে- সিলেট বেল্ট, যার মধ্যে রয়েছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার। তারপর রয়েছে ফরিদপুর বেল্ট, যেখানে রয়েছে ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরিয়তপুর এবং সবশেষে রয়েছে মধ্য ঢাকার বেল্ট যার মধ্যে রয়েছে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ইত্যাদি অঞ্চল। মূলত এ তিনটি অঞ্চল থেকেই ইউরোপগামী বাংলাদেশিদের ঢল এসে থাকে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈধ পথে যাওয়ার পথ সংকীর্ণ হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্থল ও সমুদ্রপথে যাওয়ার প্রবণতা বেশি।
এক ভুক্তভোগী জানান- স্থলপথে দালালের মাধ্যমে সাড়ে ২২ লাখ টাকা খরচ করে ইতালি পৌঁছেছেন তিনি। প্রথমে বাংলাদেশ থেকে দুবাই গিয়েছেন। দুবাই থেকে লিবিয়া। সেখানে চার মাস থাকার পর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছি ছোট নৌকায়, তারপর ইতালি পৌঁছেন। ইউরোপের নেশা এক ভয়ংকর নেশা। ঝুঁকি নিয়ে এভাবে কাউকে না আসার জন্য অনুরোধও জানান তিনি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত জীবন ও আর্থিক সচ্ছলতার জন্য বাংলাদেশিদের একটি ট্রেন্ড চলছে ইউরোপে পাড়ি জমানোর। এছাড়া অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনার ব্যর্থতাও একটি বড় কারণ হিসেবে মনে করেন তারা।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান জানান, গত কয়েক বছরে ইউরোপ থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের মধ্যে ইতালি, গ্রিস ও জার্মানি থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বেশি। তিনি আরও বলেন, ঝুঁকি নিয়ে যেন বাংলাদেশিরা ইউরোপে না যান, সে বিষয়ে সারা দেশে সচেতনতা তৈরির কাজ চলছে।
অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ইউরোপের দেশগুলো অনেক সময় অভিবাসন আইন শিথিল করে অথবা বৈচিত্র্যের জন্য অ্যাসাইলামের সুযোগ দেয়। মানুষের মধ্যে একটা ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে, যেভাবেই হোক একটা পর্যায়ে সেখানে থেকে যাওয়া যাবে। দেশে ফেরত আসতে হবে, এ চিন্তা তাদের থাকে না।
তিনি আরও বলেন, এখানে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত, সেটি বাংলাদেশ একা মোকাবেলা করতে পারবে না। আর আন্তর্জাতিকভাবে যেসব নেটওয়ার্ক কাজ করে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে কোনো দেশই খুব বেশি সফল হয়নি।
রাইট টার্ন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম নবী তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন- ‘বিদেশে যাওয়া অপরাধ নয়। কিন্তু বিদেশে গিয়ে নিজের দেশকে ছোট করা অপরাধ। প্রবাসীরা বাংলাদেশের অঘোষিত দূত, এটা আমাদেরকে বুঝতে হবে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের বুঝতে হবে, আচরণ দিয়েই বিশ্ববাসী আমাদের দেশকে চেনে। যে দেশের নাগরিক সত্যবাদী, দায়িত্বশীল ও আইন মান্য করে, সেই দেশের সম্মান তৈরি হয় বিদেশের মাটিতে। বিদেশে গিয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখার সঙ্গে সঙ্গে দেশের মর্যাদাও টিকিয়ে রাখা জরুরি।’
কেকে/সাশ