স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধ থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে লড়বে না দলটি। তারা এককভাবে প্রার্থী বাছাই করে কাজ করছেন।
এরইমধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে কর্মশালা এবং প্রশিক্ষণ সভা করে চলেছে দলটি। এসব কর্মশালায় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি, প্রার্থীদের সততা, যোগ্যতা, নৈতিকতা বজায় রেখে মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা এবং সমাজ থেকে দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত ইউনিয়ন পরিষদ গড়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলটি অন্তত বছরখানেক আগে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। সব শেষে সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী বাছাই করে দলটি। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে জয়লাভকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে জামায়াত।
এক বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি
আগামী রমজানের পর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে। সেই লক্ষ্য ধরে নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করে জামায়াত। গত বছরের জানুয়ারি থেকে পরের কয়েক মাসে ঢাকার দুই সিটির ১২৯টি ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর বাছাই করেছে জামায়াত। এ নেতারা তখন থেকেই ওয়ার্ড পর্যায়ে ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন। সংসদ নির্বাচনের সময়েও নিজেদের প্রচার চালান। ঢাকা-৮ আসন এনসিপিকে ছেড়ে দিলেও ওয়ার্ডগুলোতে জামায়াতের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভোটের প্রচার চালিয়ে আসছেন।
ঢাকা উত্তরে সেলিম, দক্ষিণে সাদিক কায়েম
সম্প্রতি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে জামায়াত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী করা হয়েছে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে, তিনি জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) জামায়াতের প্রার্থী করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি আবু সাদিক কায়েমকে।
বিষয়টি নিয়ে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও স্থানীয় নির্বাচনে সব দল আলাদাভাবে নির্বাচন করবে। সেজন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের ২ প্রার্থী ঠিক করা হয়েছে। উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণ সিটিতে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম নির্বাচন করবেন।
জোট থাকলেও মেয়র পদে ছাড় নয়
জামায়াত জোটের শরিক এনসিপিও ঢাকায় একটি মেয়র পদ চায়। যদিও দুই সিটিতেই তারা নিজেদের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা দক্ষিণ ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করেন দলটির আহ্বায়ক এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তবে জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, ঢাকায় মেয়র পদে জোট শরিকদের ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। কাউন্সিলর পদে সমঝোতা হতে পারে। ২০০৩ সালের নির্বাচনে জামায়াত অবিভক্ত ঢাকায় একটি এবং ২০১৫ সালে উত্তরের একটি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে জয় পেয়েছিল।
ইসির প্রতি সমান সুযোগ নিশ্চিতের আহ্বান
জামায়াতে ইসলামী আসন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক করতে এবং সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে সব প্রার্থীর জন্য পর্যাপ্ত সময়, নিরাপদ পরিবেশ এবং সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। কোনো প্রশাসনিক অজুহাতে নির্বাচন যেন পিছিয়ে না দেওয়া হয়, সে বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন।
বিগত দিনে জামায়াতের নির্বাচন
২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে ৩৬ উপজেলায় চেয়ারম্যান, ১২৬ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২৬ উপজেলায় নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছিল জামায়াত। এরপর তারা আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। দলটি নিবন্ধন হারালেও ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৭৯টিতে চেয়ারম্যান পদে জামায়ত সমর্থিত প্রার্থীরা জয় পান। ২০১৯ সালে তারা চারটি পৌরসভায় জেতে।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ভোটের জন্য প্রস্তুত। সিটি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণ অতীতে ভোট দিলেও তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং সেই ভোট রক্ষা করতে না পারাটা তাদের এক ধরনের দুর্বলতা ছিল। এবার আমরা থামব না, আমাদের থামার সুযোগ নেই। সামনে সিটি নির্বাচন, এতে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে শক্তিশালী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
কেকে/সাশ