রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মোহাম্মদপুর। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর, থানাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যালয়, মন্ত্রীর বাসভবন, একাধিক নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে জনবহুল এ এলাকায়। তবু এ এলাকাটি গত কয়েক বছরে বারবার আলোচনায় এসেছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে। দিনেদুপুরে ছিনতাই, চুরি, হত্যকাণ্ড, জমিদখলসহ নানা অপরাধের স্বর্গভূমিকে পরিণত হয়েছে মোহাম্মদপুর। এতে এ অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর এলাকায় রয়েছে মোহাম্মদপুর থানা, দুটি পুলিশ ফাঁড়ি, ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনারের কার্যালয়, এসআরবি-২-এর প্রধান কার্যালয় এবং স্পেশাল সিকিউরিটি এন্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়নের (এসপিবিএন) কার্যালয়।
এ ছাড়া জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বাসভবন, ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের কার্যালয়, আনসার ব্যাটালিয়নের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাসভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসস্থান রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, পাসপোর্ট অফিস।
এত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির পরও অপরাধের অভিযোগ অব্যাহত থাকায় উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকাটিতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে লালমাটিয়া মহিলা কলেজ, ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তর রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০ অক্টোবর ভোরে শহীদ বুদ্ধিজীবী রোডে এক ব্যক্তি ছিনতাইয়ের শিকার হন। একই দিন সন্ধ্যায় সলিমুল্লাহ রোডের ৪ নম্বর গলিতে অটোরিকশায় আসা দেশীয় অস্ত্রধারীরা এক পথচারীর কাছ থেকে ছিনতাই করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর কয়েক দিন আগে বাবা ও ছেলেকে গুলি ও কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা।
গত ২১ অক্টোবর বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিট। মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের অনুপম গলিতে হাঁটছিলেন দুই তরুণ-তরুণী। এ সময় একটি অটোরিকশা থেকে নেমে বড় সামুরাই বের করে তাদের ঘিরে ধরে দুই ছিনতাইকারী। পরে দেশীয় অস্ত্র হাতে আরও দুজন তাদের সঙ্গে যোগ দেন। শুরু হয় ধস্তাধস্তি। একপর্যায়ে ওই তরুণ-তরুণীকে হেনস্তা করে তাদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। সেখানকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন এক সপ্তাহে ৫ বার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে ছিনতাইকারীদের তৎপরতায় আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে ভোর ও রাতে পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তিন স্তরে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মোহাম্মদপুরে সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে তিন স্তরের একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
প্রথম স্তরে বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী দেশের সহযোগীদের মাধ্যমে অপরাধচক্র পরিচালনা করে বলে অভিযোগ।
দ্বিতীয় স্তরে দেশের ভেতরে থাকা কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করেন। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ।
তৃতীয় স্তরে মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসী ও সহযোগীরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করে বলে অভিযোগ। এসব অপরাধ থেকে আদায় করা অর্থের একটি অংশ বিদেশে অবস্থানরত অপরাধচক্রের সদস্যদের কাছেও পৌঁছায় বলে সূত্রগুলোর দাবি।
তিন মাসে ২৯০ মামলা, গ্রেপ্তার ১ হাজার ১৫৫ জন
মোহাম্মদপুর থানা সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর— এই তিন মাসে থানায় ২৯০টি মামলা হয়েছে এবং ১ হাজার ১৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া এলাকাটিতে ডিএমপির বিভিন্ন অভিযানে আরও প্রায় ১ হাজার ৫০ জনকে আটক বা গ্রেপ্তার এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অভিযানে মাদক, চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। বিপুলসংখ্যক মামলা ও গ্রেপ্তারের পরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে মাঠপর্যায়ের অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থের জোগানদাতারা থেকে যাচ্ছেন বাইরে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীদের কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে যুক্ত হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের আর্থিক সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে।
জমি ও প্লট দখল নিয়ে উদ্বেগ
মোহাম্মদপুরে জমি ও প্লট দখলের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভয়ভীতি প্রদর্শন, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও অস্ত্রের হুমকি দিয়ে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
একাধিক প্রশাসনিক কার্যালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির পরও মোহাম্মদপুরে অপরাধের অভিযোগ অব্যাহত থাকায় অপরাধ প্রতিরোধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম বলেন, আগের থেকে অপরাধ কমতে শুরু করেছে। আমরা এখন শুধু ছিনতাইয়ের ওপর জোর দিচ্ছি। এ ছাড়া অন্য অপরাধীদের নিয়েও কাজ করছি। গত দুই দিনে ১১৬ জন অপরাধীকে আটক করেছি। এখন থেকে শুধু ছিনতাইকারীদের জন্য বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খোলা কাগজকে বলেন, মোহাম্মদপুর ঢাকার একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, যেখানে দীর্ঘ দিন ধরে ভয়াবহ অপরাধের পরিসংখ্যান পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং অপরাধ পরিস্থিতি বারবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, এলাকাটি দীর্ঘ সময় ধরে অপরাধীদের প্রধান আবাসে পরিণত হলেও এখানে আইনের ধারাবাহিক ও কঠোর প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের সঙ্গে অপরাধীদের আর্থিক ভাগবাটোয়ারার সম্পর্ক আছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ আড়ালে থেকে নিজস্ব অর্থ ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য অপরাধীদের প্রতিনিয়ত সুরক্ষা দিয়ে থাকেন বলে তিনি মনে করেন।
কেকে/সাশ