সবুজ পাহাড়, মেঘের ভেলা আর আদিবাসী সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় রূপ নিয়ে গঠিত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান)। আপাতদৃষ্টিতে একে অপার্থিব সৌন্দর্যের লীলাভূমি মনে হলেও, এর ভেতরে প্রতিনিয়ত জ্বলছে এক অশান্ত ক্ষোভের আগুন। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, সহিংসতা এবং জাতিগত দাঙ্গা এই অঞ্চলের শান্তিকে বিঘ্নিত করেছে।
সাম্প্রতিক সময়েও সামান্য তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড় উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, ঝরছে তাজা প্রাণ। প্রশ্ন ওঠে—বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও পাহাড়ের গভীরে এমন কী গভীর ক্ষত বা সমীকরণ রয়েছে, যা বারবার এই অঞ্চলকে অশান্ত করে তোলে? আসলে, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের নেপথ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক এক জটিল জটলা।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার এবং পাহাড়ের সশস্ত্র গোষ্ঠী শান্তিবাহিনীর রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর মধ্যে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল পাহাড়ের দীর্ঘদিনের জাতিগত সংঘাতের অবসান ঘটানো।
তবে আড়াই দশক পেরিয়ে গেলেও চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো, যেমন—আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং পাহাড়িদের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এই অপূর্ণতা পাহাড়ের আদিবাসীদের মধ্যে এক ধরনের গভীর হতাশা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করেছে। পাহাড়ের সংকটের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং প্রধান গভীরতম কারণ হলো ‘ভূমি সমস্যা’।
১৯৭০ এবং ৮০-এর দশকে তৎকালীন সরকারের পুনর্বাসন কর্মসূচির অধীনে সমতল ভূমি থেকে লাখ লাখ বাঙালি পরিবারকে পাহাড়ে এনে বসতি স্থাপন করানো হয়। এর ফলে পাহাড়ের জনসংখ্যাগত ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসে। বাঙালিদের স্থায়ী আবাসন এবং চাষাবাদের কারণে পাহাড়িদের ঐতিহ্যগত জুম চাষের জমি এবং বনাঞ্চল বেদখল হতে থাকে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত ল্যান্ড কমিশন বছরের পর বছর ধরে নিষ্ক্রিয় থাকায় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাতের বারুদ চিরকালই জ্বলন্ত থেকে গেছে।
পাহাড়ে অশান্তির আরেকটি বড় কারণ হলো আদিবাসী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। একসময়ের একক সংগঠন পিসিজেএসএস ভেঙে বর্তমানে ইউপিডিএফ, পিসিজেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), এবং অতি সাম্প্রতিক কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট-এর মতো একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে এই সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে।
সাধারণ পাহাড়িদের একাংশ সামরিক উপস্থিতিকে তাদের স্বাধীনভাবে বাঁচার অন্তরায় বলে মনে করেন। যার ফলে স্থানীয় জনগণের সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে কল্পিত ও মিথ্যা একটি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। পাহাড়ের অশান্তির গভীরে রয়েছে বিশাল এক ‘সংঘাত-কেন্দ্রিক অর্থনীতি’।
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোকে পুঁজি করে সেখানে কাঠ পাচার, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, মাদক চোরাচালান এবং ট্যুরিজম স্পট ও সীমান্ত বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক নীরব প্রতিযোগিতা চলে। বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ ও স্বার্থান্বেষী মহলের আয়ের মূল উৎস পাহাড়ের এই ছায়া অর্থনীতি ও চাঁদাবাজি। শান্ত পরিবেশ থাকলে এই অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে, তাই একটি নির্দিষ্ট চক্র সব সময়ই পাহাড়কে অশান্ত রাখতে চায়। এবং সাধারণ পাহাড়ি ও প্রশাসনের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি ও বৃদ্ধির সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত ও সংবেদনশীল। এর সাথে ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত যুক্ত। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এই ট্রাই-জাংশন (তিন দেশের সীমান্ত অঞ্চল)-কে অশান্ত রাখতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির একটা গোপন খেলা সবসময়ই সক্রিয় থাকে।
মিয়ানমারের অস্থিরতা, ওপার সীমান্তের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কোনো বিদেশি শক্তির প্রচ্ছন্ন মদদও পাহাড়ের এই আগুনে হাওয়া দেয় বলে বিভিন্ন সময়ে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা দাবি করেছেন।
বাংলাদেশের পাহাড় বারবার অশান্ত হওয়ার কারণ কোনো একক ঘটনা নয়, বরং এটি দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা, অবিশ্বাস আর রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের সমষ্টি। পাহাড়ের এই চিরস্থায়ী ক্ষত নিরাময় করতে হলে কেবল সামরিক শক্তি বা সাময়িক ১৪৪ ধারা জারি করে লাভ হবে না। পাহাড়ের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে। শান্তি চুক্তির পূর্ণ ও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির যে সমস্ত মৌলিক ধারা (যেমন—আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর) এখনো ঝুলে আছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। আঞ্চলিক পরিষদকে শক্তিশালীকরণ করা অপরিহার্য।
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং আঞ্চলিক পরিষদকে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া, যাতে স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালিরা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে অংশ নিতে পারে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। পাহাড়ে সক্রিয় আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার পথ খোলা রাখা এবং তাদের অস্ত্র পরিহার করে গণতান্ত্রিক ও মূলধারার রাজনীতিতে আসার সুযোগ করে দেওয়া। ভূমি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য ল্যান্ড কমিশনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে পূর্ণাঙ্গভাবে সক্রিয় করা। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যকার জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ আইনগত ও নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তি করা। পাহাড়ি অঞ্চলের ভূমির মালিকানা ও সীমানা নির্ধারণে আধুনিক ও ডিজিটাল ল্যান্ড সার্ভে বা ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস) করা, যেখানে আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার এবং বাঙালিদের বৈধ মালিকানা স্পষ্ট করা থাকবে।
প্রভাবশালী মহলের রিসোর্ট, বহিরাগতদের বাগানবাড়ি বা বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রকল্পের নামে পাহাড়িদের জমি জবরদখল অবিলম্বে বন্ধ করা। আলোচনা করে সমাধান করতে হবে। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর বিওপি সংখ্যা বাড়িয়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা, যাতে ওপার থেকে মাদক, অস্ত্র চোরাচালান বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়। পাহাড়ে সক্রিয় বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের প্রধান আয়ের উৎস হলো ‘অবৈধ চাঁদাবাজি’। এই জবরদস্তিমূলক চাঁদা আদায় কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে, যাতে সাধারণ ব্যবসায়ী ও পর্যটকেরা স্বস্তিতে থাকতে পারেন।
টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকশিত করতে হবে। পর্যটন খাতের উন্নয়ন এমনভাবে করা উচিত যাতে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি না হয় এবং এই আয়ের একটি বড় অংশ স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগে। যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। দুর্গম পাহাড়ি উপজেলাগুলোর সাথে মূল শহরের সড়ক ও মোবাইল নেটওয়ার্ক যোগাযোগ উন্নত করা, যেন প্রান্তিক মানুষ দ্রুত আইনি বা প্রশাসনিক সহায়তা পেতে পারে।
পারস্পরিক সংলাপ ও সহাবস্থান নিশ্চিত করে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূরীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিদ্যমান জাতিগত অবিশ্বাস দূর করতে নিয়মিত ‘আন্তঃজাতি সংলাপ’ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের আয়োজন করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাহাড়ের সাধারণ ঘটনাকে জাতিগত দাঙ্গায় রূপ দেওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে, তা কঠোরভাবে নজরদারি করা।
সাইবার ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে পাহাড়ে উসকানিমূলক গুজব ছড়ানো প্রতিহত করা। পাহাড়ি তরুণদের জন্য সমতলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা ব্যবস্থার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, যাতে তারা অস্ত্র বা অপরাধের পথ বেছে না নেয়। পাহাড়ের দুর্গম এলাকাগুলোতে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য মূলধারার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে অনেকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ কিংবা সমর্থন দেবে না।
সাদা চোখে দেখলে মনে হয় যে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই অশান্তির জন্য দায়ী। আসলে তা নয়। আমার অনেকবার পার্বত্য-এলাকা ভ্রমণ এই অভিজ্ঞতা দিয়েছে যে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র একটা অংশ অশান্তির কাজে জড়িত। সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশ শান্তি চাই। তাদের সঙ্গে নিয়েও কাজ করতে হবে, তাদের পাশে থাকতে হবে। মনোভাব যাতে ইতিবাচকই থাকে তার জন্য কমিউনিটি পুলিশিং কিংবা বিভিন্ন শান্তিকমিটিতে স্থানীয় সব গ্রুপকে অন্তর্ভুক্তি করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর তরুণদের সমন্বয়ে বিশেষ পুলিশ বা আনসার ব্যাটালিয়ন গঠন করা। এতে নিজেদের এলাকার সুরক্ষায় স্থানীয়রা সম্পৃক্ত বোধ করবে। পাহাড়িদের মধ্যেও বৈষম্য বিদ্যমান। ক্ষুদ্র অংশগুলো এখনো অবহেলিত। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরার জনগোষ্ঠী বেশি সুবিধা ভোগ করে।
পাহাড়ের শান্তি কেবল ওই অঞ্চলের মানুষের জন্যই নয়, সমগ্র বাংলাদেশের অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্যও সমভাবে জরুরি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বা পাহাড়কে স্থায়ীভাবে শান্ত রাখতে হলে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বা সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার কাঠামোগত সংস্কার।
পুলিশ সাধারণের মধ্যে মিশে যেতে পারলে এবং সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেশপ্রেমের জন্য কিংবা বাংলাদেশের অখণ্ডতার প্রতি আনুগত্য সৃষ্টি/বৃদ্ধি করতে মোটিভেশনাল কাজ করতে পারে। গভীরের তথ্য বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানতে পেরে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দাবাহিনীকে যথেষ্ট সহযোগিতা করতে পারে।
আমার অভিজ্ঞতা বলে, অনেক নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সরকারের পক্ষেই আছে, তারা অনেক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে চান। কিন্তু তাদের প্রতি সম্মান কিংবা সরকারের প্রতি আস্থার জায়গাটা দেখাতে বিভিন্ন প্রমাণক লাগবে। এজন্য সরকারকে কিছু রাজনৈতিক শক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক
কেকে/সাশ