অ্যানথ্রপিক তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মডেলের নাম রেখেছে ‘মিথোস’। এই নামকরণ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় ‘মিথোস’ বলতে এমন এক মৌলিক বাস্তবতা বা আদি কাহিনিকে বোঝায়, যা আমরা নিজেদের এবং পরস্পরের কাছে বলা গল্পের মধ্য দিয়ে অনুকরণ করি কিংবা বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি। প্রাচীন রোমান লেখক প্লিনি দ্য এল্ডার যেরকম একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। পঞ্চম শতাব্দীর গ্রিক চিত্রশিল্পী জিউক্সিস এত নিখুঁতভাবে আঙুরের ছবি এঁকেছিলেন যে পাখিরাও সেগুলোকে সত্যিকারের আঙুর ভেবে ভুল করেছিল।
কিন্তু গল্প কেবল আগে থেকে বিদ্যমান বাস্তবতার অনুকরণ করে না। গল্প নতুন বাস্তবতাও সৃষ্টি করতে পারে। কোনো কিছু কীভাবে সম্ভব, সে সম্পর্কে মানুষের কল্পনা ও বিশ্বাসকে প্রকাশ করার মধ্য দিয়েই গল্প বাস্তবতার রূপান্তর ঘটায়।
উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের শুরুর কথাগুলো স্মরণ করা যায়—‘আমরা এই সত্যগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করি।’ এই বক্তব্যে শ্রেণি, সম্পদের মালিকানা কিংবা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের পার্থক্য নির্বিশেষে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই মৌলিক বিশ্বাস বা আখ্যানের মধ্য দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা স্বাধীনতা ও সাম্যের ভিত্তিতে শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমানের সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলগুলোর মধ্যেও এই দুই ধরনের আখ্যানের উপস্থিতি রয়েছে। একদিকে, এগুলো অতীতের মানবীয় চিন্তা ও জ্ঞানের অনুকরণ করে। ব্যবহারকারীর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রশিক্ষণের সময় বিপুল পরিমাণ সংরক্ষিত তথ্য থেকে শেখা বিভিন্ন ধরন ও সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রাসঙ্গিক উত্তর তৈরি করে।
অন্যদিকে, এসব মডেল ভবিষ্যতের একটি নতুন বাস্তবতার কল্পনাও হাজির করছে। অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের প্রতিষ্ঠাতারা যেন এমন এক ধারণায় বিশ্বাসী, যেখানে অচিরেই সর্বশক্তিমান এআই-দেবতার আবির্ভাব ঘটবে এবং মানবজাতিকে নিয়ে যাবে মানুষের বর্তমান সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা এক স্বপ্নের জগতে—যাকে বলা হয় ‘ট্রান্সহিউম্যান ইউটোপিয়া’।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্বপ্ন কি সত্যিই মানবকল্যাণের জন্য, নাকি বাজারের আধিপত্য, বিপুল সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতাকে বৈধতা দেওয়ার একটি অজুহাত?
অ্যানথ্রপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টোফার ওলাহর মতো কেউ কেউ এখন প্রতিষ্ঠানটির এআই মডেলগুলোকে নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই উদ্যোগ কি অনেক দেরিতে নেওয়া হচ্ছে না? অ্যানথ্রপিক যদি সত্যিই ক্লডের আচরণকে মানবজাতির কল্যাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে চাইত, তাহলে প্রথমেই তাদের প্রকৌশলীদের প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া উচিত ছিল।
বাস্তবে ক্লডকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে একটি সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে—তথ্য সরবরাহ, সমস্যা সমাধান এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন। এআইকে বাজারে উপস্থাপন করা হচ্ছে মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে; এটি এমন এক প্রযুক্তি, যা স্বল্প ব্যয়ে বিপুল দক্ষতার সঙ্গে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের বিকল্প হতে পারে।
এই বাস্তবতার পর নৈতিকতার শিক্ষা যুক্ত করা হলে তা অনেক ক্ষেত্রেই কেবল বাহ্যিক সাজসজ্জা হয়ে দাঁড়ায়। এর আড়ালে থেকে যায় প্রযুক্তির মূল অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে এআই নিয়ে জনমনে বাড়তে থাকা উদ্বেগ প্রশমিত করার চেষ্টাও চলে।
প্রযুক্তির স্বপ্ন ও তার বিপদ
কোনো আদি কাহিনি বা মৌলিক বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত কেমন বাস্তবতা তৈরি করবে, তা নির্ভর করে সেই বিশ্বাস যে সাংস্কৃতিক পরিবেশে কাজ করছে, তার ওপর। কোনো সমাজ যদি এআইকে কল্যাণকর, অতিবুদ্ধিমান ও প্রায় দেবতুল্য শক্তি হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে এর সৃষ্ট ঝুঁকিগুলোও বাড়তে পারে। যেমন, এআই এজেন্ট মানুষের স্বার্থের বিপরীতে কাজ করতে পারে কিংবা এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যার পরিণতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
অন্যদিকে, কোনো সমাজ যদি সীমাহীন ঔদ্ধত্যের বিরোধিতা করে এবং সামাজিক সহযোগিতার বিকল্প আখ্যানকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে প্রযুক্তির দম্ভ ও তার বিপজ্জনক পরিণতি নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাও বাড়বে।
পশ্চিমা চিন্তাজগতে এ ধরনের উদ্বেগের গভীর ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস লিখেছিলেন, সূর্যও তার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারবে না; অতিক্রম করলে ন্যায়বিচারের রক্ষক এরিনিয়েস তাকে খুঁজে বের করবে।
গ্রিক পুরাণের এই এরিনিয়েস বা ফিউরিস ছিলেন অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণকারী শক্তি। এস্কাইলাসের ইউমেনিদিস নাটকে তারা ওরেস্তেসকে তাড়া করেন। ওরেস্তেস তার পিতা আগামেমননের হত্যার প্রতিশোধ নিতে নিজের মা ক্লাইটেমনেস্ত্রাকে হত্যা করেছিলেন। আবার ক্লাইটেমনেস্ত্রা তার কন্যা ইফিজেনিয়াকে বলি দেওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে আগামেমননকে হত্যা করেছিলেন। ট্রয়ের বিরুদ্ধে গ্রিক বাহিনীর নৌযাত্রার অনুকূল বাতাস পাওয়ার জন্য দেববাণী অনুযায়ী ইফিজেনিয়ার জীবন উৎসর্গ করা হয়েছিল।
এভাবেই এক প্রজন্মের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, প্রতিশোধ ও ঔদ্ধত্য পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো শক্তিই সীমাহীন নয়; ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব ও সীমারেখা না থাকলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের ‘মিথোস’ কোন নৈতিক সীমারেখা অনুসরণ করবে, কিংবা আদৌ কোনো সীমারেখা মানবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। তবে ইতিহাস আমাদের সতর্ক থাকতে শেখায়।
বিংশ শতাব্দীতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো গড়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল মানুষের অযৌক্তিক ক্ষমতালিপ্সা সম্পর্কে উপলব্ধি। বিশেষত, ‘পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস’—অর্থাৎ পারমাণবিক যুদ্ধে এক পক্ষের আক্রমণের জবাবে অন্য পক্ষের পাল্টা আঘাতে উভয়ের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার বাস্তবতা—মানুষকে বুঝতে বাধ্য করেছিল যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতার কোনো কোনো পরিণতি সবার জন্যই আত্মঘাতী হতে পারে।
এখানে সামাজিক সহযোগিতা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ও আধিপত্যের অযৌক্তিক প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণ করার পথ তৈরি করেছিল।
মানবপ্রকৃতি বদলায়নি, কিন্তু আমাদের সামনে আসা হুমকির ধরন বদলে গেছে। নিয়ন্ত্রণহীন এআইয়ের বিপদ যে বাস্তব, তা বোঝার জন্য আমাদের আর নিছক কল্পনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। এরই মধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে।
ওপেনএআইয়ের এজেন্টগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাগিং ফেসের সিস্টেমে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। এতে বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও পরবর্তী সময়ে একই ধরনের আরও ঘটনার তথ্য সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি এতটা সৌভাগ্যজনক নাও হতে পারে।
এআই এজেন্ট অনুমতি ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হতে পারে কিংবা নতুন ধরনের রোগজীবাণু তৈরির কাজে সহায়তা করতে পারে। এসব ঝুঁকির কোনোটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আইনবিদ অন্তরা হালদার আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, সামাজিক সহযোগিতা এবং সবার যৌথ সম্পদ বা ‘কমন্স’ সংরক্ষণের ধারণা দীর্ঘকাল ধরে মানুষের ঔদ্ধত্য, লোভ ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাজনিত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে।
তবে ধ্রুপদি অর্থনীতির ‘যুক্তিবাদী মানুষ’ ধারণা—যে মানুষ মূলত নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ করে—সামাজিক সহযোগিতার এই মৌলিক আখ্যানকে অনেকটা আড়াল করে রেখেছে। তা সত্ত্বেও এই ধারণা হারিয়ে যায়নি। সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে আত্মত্যাগ ও সেবার ঐতিহ্যকে ধারণ করা গল্পগুলো এখনো টিকে আছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য নতুন নৈতিক সম্ভাবনা কল্পনা করেন এমন মানুষেরও অভাব নেই।
এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা
আজ সামাজিক সহযোগিতার প্রবক্তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক বিপর্যয় ঠেকাতে যে সাহস, বিচক্ষণতা ও কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দেওয়া হয়েছিল, সেদিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে পারেন। পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সমঝোতা গড়ে তোলা সহজ ছিল না। তবু দেশগুলো বুঝতে পেরেছিল, এই হুমকি মোকাবিলায় এককভাবে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে নিরাপদ থাকা সম্ভব নয়।
এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায়ও একই ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
ভাবা যেতে পারে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান কমিশন গঠন করা হবে। এসব কমিশনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সরাসরি তথ্য সংগ্রহের সুযোগ থাকবে, যাতে তারা এআইয়ের নির্দিষ্ট মডেলগুলো কী ধরনের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে, তা নিজেরাই যাচাই করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সর্বজনীন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপত্তাবিধি। এআই উন্নয়ন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কিছু নিরাপত্তামান বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে সম্ভাব্য বিপদ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায় এবং কোনো ঝুঁকি দেখা দিলে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।
এ ধরনের ব্যবস্থা শুধু প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি মানবজাতির সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও।
লেখক: নিউইয়র্ক ল স্কুলের আইন বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনূদিত
কেকে/সাশ