রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পালটা ধাওয়া, সংঘর্ষ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। আটকা পড়া প্রায় ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া গেছে, এটি স্বস্তির বিষয়। তবে এই স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী, কারণ সংকটের মূল কারণগুলো এখনো অমীমাংসিত।
জেলা প্রশাসন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে। ২৪ অক্টোবর গতকাল রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের নতুন কর্মসূচিও ঘোষিত হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ শুরু করে।
একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর সশস্ত্র সদস্যদের সরানো এবং স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ তিন দফা দাবিতে এ কর্মসূচি দেওয়া হয়। ফলে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক পর্যটক আটকা পড়েন। নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় তাদের খাগড়াছড়ির দিকে নেওয়ার সময় গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকায় গাড়িবহর বাধার মুখে পড়ে এবং একপর্যায়ে গোলাগুলি হয়। ঘটনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী।
অবরোধকারীদের অভিযোগ, জনসংহতি সমিতির (সন্তু গ্রুপ) সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতিতে স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীন; জেএসএস তা অস্বীকার করে ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলেছে। সেনাবাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালালে আত্মরক্ষায় পালটা গুলি চালানো হয়; ইউপিডিএফ বলছে, নিরাপত্তা বাহিনীই একতরফা গুলি চালিয়েছে। ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ আবার অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ ও ভাঙচুরের অভিযোগ করেছে।
এই অভিযোগ-পালটা অভিযোগের মধ্যে সত্য উদঘাটনের একমাত্র পথ নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। কারা গুলি চালিয়েছে এবং সহিংসতা কীভাবে শুরু হয়েছে, তা স্পষ্ট না হলে অবিশ্বাস আরও গভীর হবে।
এর মধ্যে জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। গঙ্গারাম এলাকা জনশূন্য, আতঙ্কে বহু মানুষ ঘর ও দোকান ছেড়ে গেছেন। শুক্রবারও অবরোধ চলেছে। পর্যটননির্ভর রিসোর্ট, কটেজ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ; নিত্যপণ্য পরিবহন ও জুমের ফসল বাজারজাতও ব্যাহত। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে সাধারণ পাহাড়িদেরকেই।
পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে, টহল জোরদার করা হয়েছে, তদন্ত শুরু হয়েছে এবং যৌথ অভিযান চলছে। কিন্তু শুধু অভিযান ও টহলে স্থায়ী শান্তি আসবে না। বলপ্রয়োগ হতে হবে সংযত, আইনানুগ ও জবাবদিহিমূলক, বিশেষ করে যে অঞ্চলে ইতিহাসগত কারণেই আস্থার সংকট রয়েছে।
গোলাগুলি, লাঠিচার্জ ও ভাঙচুরের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে ফল প্রকাশ করতে হবে; দোষী যে পক্ষেরই হোক, আইনের আওতায় আনতে হবে। সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সমান আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কাউকে প্রশ্রয় বা বেছে লক্ষ্যবস্তু করার ধারণা তৈরি হলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
সরকার, প্রশাসন, কারবারি-হেডম্যান, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের অংশগ্রহণে এমন কাঠামো দরকার, যাতে সংকট সড়কে গড়ানোর আগেই আলোচনায় মীমাংসা হয়। ঘরছাড়াদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনী যেন ভীতির নয়, ভরসার প্রতীক হয়। স্থানীয় অংশগ্রহণভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পর্যটন পুনরায় চালু এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও জুমচাষিদের সহায়তার উদ্যোগ নিতে হবে। অবরোধে ভোগান্তি পোহান সাধারণ মানুষ।
শনিবারের কর্মসূচি যেন নতুন সংঘাতের কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। পাহাড়ের শান্তি দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। ঘটনা-পরবর্তী সামলানোর রাজনীতিতে সেখানে শান্তি টেকে না। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, জবাবদিহি, কার্যকর সংলাপ এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকা নিশ্চিত করেই কেবল আস্থা ফেরানো সম্ভব। নিরাপদ পাহাড়ি জনপদ গড়তে এখনই কাঠামোগত সংস্কারের পথে এগোনোর বিকল্প নেই।
কেকে/সাশ