দেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিদিনই সামনে আসছে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ। নানা সময়ে উঠা অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে— বেশির ভাগ ঘটনা মাদ্রাসাকেন্দ্রিক এবং এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্তৃক বিভিন্নভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এরমধ্যে গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছরের এক শিশুকে যৌন হেনস্তার অভিযোগে এক শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
এদিকে টঙ্গীর ঘটনা ছাড়াও চলতি সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণচেষ্টার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। গাজীপুরের গাছা এলাকায় একটি আবাসিক কওমি মাদ্রাসায় আট বছর বয়সি এক শিক্ষার্থীকে টানা তিন রাত যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে। শিশুটির মায়ের করা মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১০ থেকে ১২ অক্টোবর রাতে মাদ্রাসার স্টোররুমে নিয়ে শিশুটিকে নিপীড়ন করা হয়। পরে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও ওঠে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দুব্যক্তির বিরুদ্ধে।
পাবনা সদর উপজেলার দড়িভাউডাঙ্গা গ্রামের নুরানি মহিলা মাদ্রাসায় এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে শিক্ষক মো. আবু ইউসুফকে আটক করেছে পুলিশ। এ ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। সেখানকার ৩০ জন আবাসিক শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাভারে একটি মহিলা মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১৩ বছর বয়সি এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। ধর্ষণে সহায়তার অভিযোগে শিক্ষকের স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে অভিযুক্ত শিক্ষক পলাতক রয়েছেন। যা প্রকাশ্য আসার পর জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন সরকার ও সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাষ্কর উল্লেখ করে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ বলেন, আমি চিকিৎসার জন্য বাইরে ছিলাম। আমি ওখান থেকে কিছুটা লক্ষ্য করেছি, দেশে এসে লক্ষ্য করেছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না বলে আমি আশা করি। এজন্য যা করা প্রয়োজন তাই করব ইনশাআল্লাহ।
শনিবার সকালে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
তবে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে সোচ্চার হতে দেখা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতাদের প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল নিজের ফেসবুক ওয়ালে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ নজরুল এসব কথা বলেন। পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের আলেম সমাজে অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি রয়েছেন। ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের কেউ কেউ মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। তবে বৃহত্তর আলেম সমাজের একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
আসিফ নজরুলের ভাষ্য, কিছু ব্যক্তি শিশুদের বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত হচ্ছেন। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সংখ্যা হয়তো তুলনামূলক কম, কিন্তু বিষয়টি উপেক্ষা করার মতো নয়। তার মতে, এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও সামাজিক পর্যায়ে আরও জোরালো প্রতিবাদ প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে বিবৃতি দিয়েছে ধর্মভিত্তিক বৃহৎ সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে কোনো অনৈতিক আচরণ বা শিশু নিপীড়ন গ্রহণযোগ্য নয়। তবে কোনো অভিযোগের পর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও সমর্থনযোগ্য নয়।
বিবৃতিতে সংগঠনের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কতিপয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে নৈতিক পদস্খলনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করাটা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই জরুরি।
বিবৃতিতে হেফাজতের দুই শীর্ষ নেতা বলেন, শিশু যৌন নির্যাতনের সমস্যাটি পুরনো অভ্যন্তরীণ সামাজিক সমস্যা। এটি শুধু কোনো একটি কমিউনিটিকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। স্কুল, মাদ্রাসা এমনকি অন্যান্য পরিসরেও সমস্যাটি কম-বেশি বিদ্যমান।
তারা জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের শিক্ষার্থী নিপীড়ন রোধ করতে চলতি বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ড এবং এর আওতাভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। এতে প্রতিটি মাদ্রাসায় ‘শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি’ গঠন বা সচল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থী নিপীড়ন বা অনৈতিক আচরণের যে কোনো অভিযোগ সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে তদন্তপূর্বক রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া মাদ্রাসা বোর্ডগুলোকে শক্তিশালী মনিটরিং সেল ও অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে যে, কোনো মাদ্রাসায় ‘শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি’ না থাকলে, কমিটি নিষ্ক্রিয় থাকলে, অথবা কোনো অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সেটির অধিভুক্তি স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তি সবসময় অগ্রাধিকার দিতে হবে জানিয়ে তারা বলেন, এ ক্ষেত্রে স্কুল ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে কঠোর নীতিমালা অবলম্বন করতে হবে। সিসি ক্যামেরায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সব স্কুল-মাদ্রাসাকে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে হেফাজত নেতারা বলেন, যে কোনো নৈতিক পদস্খলনের দায়ে দোষীকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত উভয় শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো শিথিলতা বা আপস চলবে না। শৈশব ও কৈশোরের সুশিক্ষা ও নিরাপদ বেড়ে ওঠার দায়িত্বে কোনো ছাড় নয় বলে জানিয়েছে হেফাজত।
এর মধ্যেই শিশু নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে টঙ্গীতে পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুর বাবা শাহজালাল রুমি অভিযুক্ত খণ্ডকালীন শিক্ষক মো. মোসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছেন। অন্যদিকে শিক্ষককে মারধর, প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও নগদ ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে শাহজালাল রুমিসহ অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। গত শুক্রবার বিকেলে ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষের পক্ষ থেকে টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলাটি করা হয়। একইদিন বিকেলে টঙ্গীর সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি রোডে মাদ্রাসার নিজস্ব ভবনের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
এরপর ঘটনাটি নিয়ে মুখ খুলেছেন ভুক্তভোগী শিশুর বাবা শাহজালাল রুমি। তিনি বলেন, ঘটনার দিন প্রিন্সিপালের কক্ষের বাইরে প্রায় ১৫ মিনিট বসে থাকার পর অভিযুক্ত শিক্ষক এলে তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন, তিনি আসলে কী করেছেন।
শাহজালাল রুমির ভাষ্য, শিক্ষক তাকে জানান, তিনি জোরাজুরি করেছেন এবং তার মেয়েকে চুমু দিয়েছেন। এ কথা শোনার পর একজন অভিভাবক হিসেবে তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। এরপর কী ঘটেছে, তা সবাই দেখেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শাহজালাল রুমির দাবি, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতেই তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অর্থ লুটের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ১৭ লাখ টাকা তিনি নিয়ে গেছেন কি না, তা সিসিটিভি ফুটেজ দেখলেই স্পষ্ট হবে। তার দাবি, মাদ্রাসায় ভাঙচুরের অভিযোগও অতিরঞ্জিত। সেখানে একটি কাচে হাত রাখার পর সেটি ভেঙে যায় বলে জানান তিনি।
শিশুদের ওপর নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে। সংগঠনটির তথ্যমতে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৪৮৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একইসময় বিভিন্ন ঘটনায় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৫৯৮ শিশু এবং আহত হয়েছে ১১ হাজার ৪৫৮ শিশু। এ ছাড়া ওই সময়ে শিশুদের যৌন হয়রানির ১ হাজার ২৫৫টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি। গত ১০ অক্টোবর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানায় এইচআরএসএস।
কেকে/ এমএস