সময় নদীর স্রোতের মতো বয়ে চলে, কিন্তু কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো সময়ের স্রোতে ভেসে না গিয়ে স্মৃতির চরে পলির মতো জমে থাকে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (বেরোবিসাস) বারো বছরপূর্তির আজকের দিনটিও তেমনই। ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর শরতের নরম আলোয় একদল স্বপ্নবাজ তরুণ মনের একটাই সংকল্প ছিল, ক্যাম্পাসের কথা বলবে ক্যাম্পাসেরই কলম।
সেদিনের শুরুটা ছিল ছোট। না ছিল জমকালো কার্যালয়, না ছিল গোছানো কোনো আয়োজন। ছিল শুধু একটি নোটবুক, একটি কলম আর বুকে অদম্য সাহস। কখনও অ্যাকাডেমিক ভবনের সিঁড়িতে, কখনও প্রশাসনিক ভবনের বারান্দায়, কখনও স্বাধীনতা স্মারকে, আবার কখনও চায়ের কাপের ধোঁয়ার ভেতর জন্ম নিয়েছে কত খবর, কত তর্ক, কত স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের বীজই আজ বারো বছরের পরিণত বৃক্ষ হয়ে ডালপালা মেলেছে।
এখন বেরোবিসাস শুধু একটি নামের তালিকা নয়, একটি পরিবার। এখানে শেখায় সত্য কীভাবে লিখতে হয়, আর সত্য বলতে গেলে কতটা সাহস লাগে। ডেডলাইনের চাপে নির্ঘুম রাত, ভুল করলে বড়দের বকুনি আর ভালো লেখায় পিঠ চাপড়ানোর উষ্ণতা, সবই আজ মধুর স্মৃতি।
এই এক যুগে বেরোবিসাস কেবল সংবাদ সংগ্রহ করেনি, ক্যাম্পাসের সুখ-দুঃখের সাক্ষী হয়েছে। শীতের কুয়াশামাখা ভোরে শিক্ষার্থীদের দাবির মিছিলে যেমন কলম তুলে নিয়েছে, তেমনি বর্ষার বিকেলে সবুজ চত্বরে প্রথম প্রেমের গল্পও যেন ধরা পড়েছে কোনো এক সাংবাদিকের চোখে। কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, কখনো সাফল্যের গল্প ছড়িয়ে দিয়েছে দূর থেকে দূরান্তরে।
ক্যাম্পাসের নানা সমস্যা, চাপা পড়ে থাকা অসংগতি আর শিক্ষার্থীদের নীরব দীর্ঘশ্বাসগুলোও কলমের ডগায় উঠে এসেছে বারবার। এভাবেই শিক্ষার্থী, প্রশাসন ও পাঠকের মাঝখানে গড়ে উঠেছে এক নির্ভরতার সেতু।
তবে এই পথচলার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় লেখা হয়েছে ২০২৪ সালে। সেই উত্তাল দিনগুলোতে, যখন গোটা দেশ ফুঁসে উঠেছিল, রংপুরের এই ক্যাম্পাসে আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তে সামনের সারিতে ছিল বেরোবিসাস। মিছিলের গর্জন, রাজপথের উত্তাপ আর অনিশ্চয়তার প্রহরেও সংগঠনের সদস্যরা কলম ও ক্যামেরা হাতে সত্যকে তুলে ধরেছেন, থেকেছেন আন্দোলনের পাশে, অগ্রণী ভূমিকায়। সেদিন প্রমাণ হয়েছিল, সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এ এক দায়বদ্ধতা। এই অধ্যায় সংগঠনের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
এক যুগ পেরিয়ে আসা এই সংগঠনের সামনে এখন নতুন দিগন্ত। ডিজিটাল যুগের নতুন চ্যালেঞ্জ, গুজবের ভিড়ে সত্য খুঁজে ফেরার দায়িত্ব, আর মানসম্মত সাংবাদিকতার চর্চা, এসবই আগামীর পথ।
কেকে/এআই