দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে চায়ের দেশ মৌলভীবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের ঢল নেমেছিল। পাহাড়, টিলা, ঘন অরণ্য আর আঁকাবাঁকা চা বাগানের সবুজ ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো ভ্রমণপিপাসী। পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠা পুরো জেলায় তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।
ছুটিকে কেন্দ্র করে কমলগঞ্জের মনোরম মাধবপুর লেক ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতীক লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বড়লেখার পাথারিয়া পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ও ঝরনা, এবং শ্রীমঙ্গলের ৭১-এর বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ ও রাবার বাগানসহ জেলার প্রধান প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ছিল পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়। প্রকৃতির কাছাকাছি একটু স্বস্তির সময় কাটাতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে বিনোদনপ্রেমীদের।
ঢাকা থেকে সপরিবারে ঘুরতে আসা পর্যটক পিংকি জানান, পূজার ছুটির ব্যস্ততার মধ্যেও কিছুটা সময় বের করে তারা এখানে ছুটে এসেছেন। এখানকার পরিবেশ ঘুরে দেখে তারা অনেক নতুন বিষয় জানতে ও দেখতে পেরেছেন, যা তাদের ভ্রমণকে সার্থক করে তুলেছে।
রাজশাহী থেকে আগত পর্যটক সিমা রানী দেব মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, ‘এখানকার প্রতিটি জায়গাই অত্যন্ত সুন্দর এবং পুরোটাই প্রাকৃতিক বা ন্যাচারাল পরিবেশে ভরপুর।’
প্রকৃতির রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে নরসিংদী থেকে আসা পর্যটক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এখানকার চারপাশের পাহাড়, ছোট-বড় টিলা এবং সবুজে মোড়ানো চা বাগানের দৃশ্যগুলো সত্যি মনমুগ্ধকর, যা যে কারো মন কেড়ে নেবে।’
অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে খুলনা থেকে আগত কলেজ শিক্ষার্থী তসরিফুল হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশকে গভীরভাবে জানতে ও বুঝতে হলে প্রতিটি মানুষের অন্তত একবার হলেও এই চমৎকার জায়গাটিতে আসা উচিত।’
পর্যটকদের এই বাড়তি উপস্থিতি জেলার পর্যটনভিত্তিক ব্যবসাকে দারুণভাবে চাঙা করে তুলেছে। পাঁচতারকা মানের বিলাসবহুল হোটেল থেকে শুরু করে সাধারণ হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। এ টানা ছুটিতে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি ব্যবসা হয়েছে বলে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
শ্রীমঙ্গলের শান্তি বাড়ি ইকো রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীরুল আরেফিন লিংকন জানান, দুর্গাপূজা উপলক্ষে এটি তাদের ভালো একটি ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু হয়েছে। তবে ট্রেনের টিকিট স্বল্পতা ও যাতায়াত ভোগান্তিতে পর্যটকেরা বিপাকে পড়েছেন।
বালিশিরা রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক শরিফুল আলম জানান, বিগত কয়েক মাসের মন্দাভাব বা ব্যবসায়িক ঘাটতি তারা এই ছুটির সময়ে সফলভাবে কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন এবং পূজা উপলক্ষে বুকিংও বেশ ভালো ছিল।
ব্যবসা ভালো হলেও অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, পর্যটন শিল্পের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। অনেক এলাকার রাস্তার করুণ দশার কারণে পর্যটকদের যাতায়াতে কিছুটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, যা জেলার পর্যটন সম্ভাবনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মৌলভীবাজার বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের পরিচালক জাহেদ আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘পর্যটকদের প্রধান অভিযোগ হলো—খারাপ যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে এখানে পৌঁছাতেই তাদের দিন শেষ হয়ে যায়। তাই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
পাশাপাশি, পর্যটকদের বাড়তি চাহিদার কারণে অনেক সময় স্থানীয় পণ্য ও রসদ দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ছুটি চলাকালীন পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোনের ওসি কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘উৎসবের দিনগুলোতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই দেশ-বিদেশী পর্যটক ও দর্শনার্থীরা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে ছুটির আনন্দ উপভোগ করতে পেরেছেন।’
সার্বিক নিরাপত্তা বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম জানান, পর্যটকরা যেন কোনো ধরনের হয়রানি বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি না হন এবং নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতে পারেন, সেজন্য জেলার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশি টহল ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল।
কেকে/এআই