রাঙামাটির সাজেকে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে। চারদিন ধরে চলা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধে পাহাড়ে চরম অস্থিতিশীলতা ও অচলাবস্থা চলছে।
সাম্প্রতিক গুলিবিনিময় ও সহিংসতার ঘটনায় সাজেকসহ রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্থবিরতা নেমে এসেছে। তবে পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
শান্তি বজায় রাখতে রাজনৈতিক পর্যায়েও আলোচনা চলছে :
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পাহাড়ে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ ছাড়াও একই নামের বিভিন্ন গোষ্ঠী ও ফ্র্যাকশন রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পাহাড়ে অনেক গ্রুপ রয়েছে। জনসংহতি সমিতি, ইউপিডিএফ ছাড়াও আরও কয়েকটি ফ্র্যাকশন রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে। পর্যটন মৌসুমকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থেকে এসব বিরোধ তৈরি হয়। প্রতি বছর পর্যটন মৌসুমকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের কিছু জায়গা ও অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলে। এর সঙ্গে বিভিন্ন গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ কোন্দলও জড়িত।
গতকাল সচিবালয়ে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও ব্যবস্থা নেবে। পাহাড়ে শান্তি বজায় রাখতে রাজনৈতিক পর্যায়েও আলোচনা চলছে। ওই এলাকার হেডম্যান ও অন্যান্য নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, দুর্ভোগ :
সাজেক ও খাগড়াছড়ির প্রধান সড়কগুলোতে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টির কারণে সাধারণ যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী ব্রিজ, স্বনির্ভর এলাকা, খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের কৃষি গবেষণা এলাকা এবং চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের গুইমারা জোড়াব্রিজ এলাকায় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন অবরোধকারীরা। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের সাপমারা এলাকায় গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করা হয়।
এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রধান সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং টায়ার ও খড়কুটায় আগুন জ্বালিয়ে পিকেটিং করা হয়। দীঘিনালা-সাজেক সড়কের মাচালংসহ বিভিন্ন স্থানেও অবরোধকারীদের বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। অবরোধের কারণে খাগড়াছড়ি থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে।
ঢাকা থেকে আসা রাতের বাসগুলো পুলিশি পাহারায় খাগড়াছড়িতে পৌঁছেছে। রাঙামাটি জেলা শহরের বনরূপা ও কল্যাণপুর বাজারসহ অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাজেক ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে আঞ্চলিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে পাহাড়ি জনপদে এখনো থমথমে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পর্যটন খাতে ধস :
টানা অবরোধ ও অস্থিরতার কারণে সাজেক ভ্যালিতে পর্যটক প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে সাজেক ও আশপাশের এলাকার রিসোর্ট, হোটেল ও পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় ব্যাপক ধস নেমেছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে সাজেকে ছোট-বড় মিলে শতাধিক কটেজ রয়েছে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এ তিন মাস মূলত সাজেকের পর্যটন মৌসুম। এ সময়ে কটেজ মালিকরা প্রায় ৩০ কোটি টাকার ব্যবসা করে থাকেন। পর্যটকরা রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়ার জন্য প্রতিদিন খরচ করেন প্রায় ২২-২৫ লাখ টাকা।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, এখন পর্যটনের ভরা মৌসুম। অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সব বুকিং বাতিল করে পর্যটকদের টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যটকবাহী জিপ চলাচল করত, কিন্তু বর্তমানে সেগুলো বন্ধ। এছাড়া খাদ্যসামগ্রী আনা-নেওয়া এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে বিক্রি করতে না পেরে স্থানীয় সাধারণ মানুষও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, কোটি কোটি টাকার আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা। পর্যটন বন্ধ থাকায় কটেজ মালিকদের পাশাপাশি পরিবহণ খাত, স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকাও চরম সংকটে পড়েছে।
ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ও কাউখালী উপজেলার ফটিকছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উষাতন চাকমা বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করছি। তবে কাউখালীর বেতবুনিয়া এলাকায় পিকেটিংয়ের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের কর্মীদের বাধা দিয়েছে। কাউখালী-ঘাগড়া হয়ে রাঙামাটি সড়কে অবরোধ শান্তিপূর্ণভাবে চলছে।
খাগড়াছড়ি থানার ওসি মো. কায় কিসলু বলেন, ঢাকা থেকে আসা রাতের বাসগুলো পুলিশি পাহারায় শহরে নিয়ে আসা হয়েছে। শহরের কয়েকটি স্থানে পিকেটাররা টায়ার জ্বালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের ধাওয়া দেয়। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সাজেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। সেখানে পিকেটিংয়ের খবর পাওয়া যায়নি। তবে কোনো যানবাহন চলাচল করছে না।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমার সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শনিবারের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সাজেকে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে হামলা, লাঠিপেটা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদ এবং সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে এ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।
এর আগে, তিন দফা দাবিতে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। তাদের অন্যতম দাবি ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে জেএসএস।
কেকে/ এমএস