সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে বেশ কিছু মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর বলাৎকার, নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ আসছে। প্রতিটি ঘটনার পর ক্ষোভ, মামলা, কোথাও উত্তেজিত জনতার হামলা, তারপর নীরবতা। এই চক্র থেকে আমরা বের হতে পারছি না। ফলে প্রশ্নটি শুধু অভিযুক্ত শিক্ষকের শাস্তির বিষয়েই নয় বরং কোন কাঠামোর মধ্যে শিশুরা এই ঝুঁকিতে পড়ছে এবং সেই কাঠামোর ওপর রাষ্ট্রের নজরদারি কতটা কার্যকর তা খতিয়ে দেখা দরকার।
এ কথা স্পষ্ট করা দরকার যে, সব মাদ্রাসা এক নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান দায়িত্বশীলভাবে চলছে, অনেক শিক্ষক সীমিত সম্বলে আন্তরিকভাবে পড়াচ্ছেন। কয়েকটি অপরাধের দায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থা বা আলেম সমাজের ওপর চাপানো অন্যায়। কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ সংস্থা আল-হাইআতুল উলয়াও প্রায় একই কথা বলেছে। সংস্থাটি সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং সুরক্ষা কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত স্বাগত জানানোর মতো। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়।
কারণ, যে প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ উঠছে, সেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থার ওপরই তদন্ত, বিচার ও প্রতিকারের ভার ছেড়ে দিলে স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য। আবাসিক মাদ্রাসায় শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। শিক্ষা, খাদ্য, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা সবই এক কর্তৃপক্ষের হাতে। অভিযোগ জানানোর স্বাধীন পথ না থাকলে, বাইরের তদারকি না থাকলে এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার চাপ থাকলে অপরাধ চাপা পড়ে যায়। ভুক্তভোগী পরিবারকে মীমাংসায় বাধ্য করা, এমনকি বাদীকেই পাল্টা মামলায় জড়ানোর অভিযোগও আমরা শুনেছি। এসব কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়মে সামলানোর বিষয় নয়।
কওমি শিক্ষার সনদের সরকারি স্বীকৃতি এসেছে। ২০১৮ সালের আইনে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়া হয়েছে। সেই স্বীকৃতির প্রেক্ষাপটে এমপিওভুক্ত না হওয়া এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় হস্তক্ষেপ না করার মতো শর্তের কথা উঠেছিল। স্বায়ত্তশাসনের সেই কাঠামো সনদের মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীর সুরক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্নে রাষ্ট্রের ভূমিকা এখনো স্পষ্ট ও কার্যকর হয়ে ওঠেনি।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে সাংবিধানিক ও আইনি। শিশুর সুরক্ষা সংবিধান ও শিশু আইনের অঙ্গীকার। ধর্মীয় পরিচয় বা ঐতিহ্য এই দায় থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অব্যাহতি দেয় না, কারণ শিশুর অধিকার ধর্মীয় বা সাধারণ, সব প্রতিষ্ঠানেই সমান।
নিয়ন্ত্রণ বলতে আমরা মাদ্রাসা দখল, ধর্মীয় পাঠদানে হস্তক্ষেপ বা কোনো ব্যবস্থাকে অন্যটির অনুকরণে বদলে ফেলা বোঝাচ্ছি না। আমরা ন্যূনতম মানদণ্ড ও জবাবদিহির কথা বলছি। মাদ্রাসা রাষ্ট্র ও সমাজের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। নিজামিয়া থেকে সোনারগাঁয়ের মাদ্রাসা পর্যন্ত, বহু প্রতিষ্ঠান সমাজ ও প্রশাসনের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত ছিল। রাষ্ট্রের নজরদারি তাই কওমি ঐতিহ্যের পরিপন্থি নয়। ফলে এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে রাষ্ট্র তার দায় এড়াতে পারে না। সব আবাসিক কওমি মাদ্রাসার বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা, পরিচালনা কমিটি ও আবাসন-ব্যবস্থা এতে থাকবে।
প্রতিটি মাদ্রাসায় লিখিত শিশু সুরক্ষা নীতিমালা ও শিক্ষকদের আচরণবিধি থাকতে হবে। নিয়োগের আগে পটভূমি যাচাই হবে। শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করার ঘোষণাকে আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপ দিতে হবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের জন্য স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। শিশু হেল্পলাইনকে এই কাজে যুক্ত করা যায়, আর অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা গোপন রাখতে হবে। জেলা পর্যায়ে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা, শিশু সুরক্ষা কর্মকর্তা, বোর্ডের প্রতিনিধি ও অভিভাবকদের নিয়ে একটি যৌথ পর্যবেক্ষণ কমিটি এ কাজ করবে। আয়-ব্যয় ও দান-অনুদানের হিসাবে স্বচ্ছতা আনতে হবে। শিক্ষকদের ন্যূনতম বেতন, কর্মঘণ্টা ও আবাসন-সুবিধার মানদণ্ড ঠিক করতে হবে। অনিশ্চিত জীবিকা ও অসহায়তা প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্যকেও বিকৃত করে। বোর্ডগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতাকে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার পথ খুলতে হবে। ধর্মীয় বিষয়বস্তুতে কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ-সম্ভাবনা বাড়ানো সম্ভব।
শিশুর নিরাপত্তা কোনো দর-কষাকষির বিষয় নয়। ধর্মীয় শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা এবং শিশুর সুরক্ষা সরকার ও কওমি বোর্ড উভয়ের জন্যই সমান দায়িত্ব।
কেকে/ এমএস