সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,
১০ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● চার দিনের সফরে জাপান পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ● তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন আশার আলো জাপানের বাজার      ● গভীর নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে সোমবার      ● সেন্টমার্টিনে ভ্রমণের দরজা খুলছে, মানতে হবে শর্ত-গুনতে হবে ফিও      ● ডেঙ্গুতে আরও সাতজনের মৃত্যু, হাসপাতালে রোগী ভর্তিতে রেকর্ড      ● ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদগামী ফ্লাইট ৪ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত      ● হাসিনার ফেরার গুঞ্জনে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বহির্বিশ্বের রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা
রায়হান আহমেদ তপাদার
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৭ পিএম

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। যাকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত আবর্তিত হয় বিশ্বরাজনীতির মঞ্চ। বর্তমানে বিশ্বরাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হলো এই মধ্যপ্রাচ্য। বলাবাহুল্য তা অতীতেও বিরাজমান ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তথা অবস্থার সাপেক্ষে তা নেহায়েত কম প্রভাবই ফেলত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। 

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক অবস্থার দৃশ্যপট অনুধাবন কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার চিন্তার ভাঁজ খোলা এবং সহজে এ সমস্যা উদ্ধার করার জন্য শুধু এর ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে অবস্থানরত দেশগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকলে এর মূল উদ্ঘাটন সম্ভবপর নয়, দরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রাজনৈতিক অনুসন্ধান। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী দেশ হলো সৌদি আরব ও ইরান। ক্ষমতার দিক থেকে দুই দেশের দ্বন্দ্ব বহু দিনের। প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি বা মোড়লিপনার রাজনীতিতে এই দুই দেশের কেউ পিছিয়ে নেই। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি ও শক্তি অর্জন করায় আমিরাত মধ্য পূর্বাঞ্চলের রাজনীতি এবং জিওপলিটিকসে এক অপরিহার্য খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে রিজিওনাল পাওয়ার কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। 

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে দুটি শক্তি সৌদি আরব ও ইরান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে স্থান করে নেওয়ার জন্য যুগ যুগ ধরে প্রতিযোগিতা করে আসছে এবং এ প্রতিযোগিতায় শামিল হয়েছে সাম্প্রতিককালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, দেশটা এখন অত্রাঞ্চলে একক আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার প্রত্যাশা পোষণ করছে। সম্প্রতি সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা ইয়েমেন যুদ্ধকে এক নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। 

হুথিদের এটি একটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন বাজি, যা কোনোভাবেই তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে না। তারা খুব ভালো করেই জানে এর পরিণতি এবং পাল্টা হামলা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তারপরও তারা সৌদি আরবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মূলত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াতে ইরানের যে পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নের জন্য। 

পরিস্থিতি যেহেতু ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে, তাই বর্তমান প্রেক্ষাপট দুটি বড় ধরনের দৃশ্যপটের জন্ম দিতে পারে : হুথিদের বিরুদ্ধে একটি বড় আঞ্চলিক সামরিক অভিযান অথবা একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ। যদি সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইয়েমেন সরকার নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও মতপার্থক্য মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে হুথিদের বিরুদ্ধে তাদের অগ্রযাত্রা অনেকটাই থমকে যাবে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে হুথি যোদ্ধারা কেবল নিজেদের অবস্থানই শক্ত করবে না, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহরের ওপর চাপ বাড়াবে এবং সৌদির বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতি সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলবে। ফলে বেসামরিক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা বহুগুণ বাড়বে এবং কোনো চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়াই যুদ্ধ প্রলম্বিত হতে থাকবে। এর একটি বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে সৌদি আরবের ওপর। 

প্রতিরক্ষা খাতে অস্বাভাবিক খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। যেহেতু সৌদি আরব এই অঞ্চলের অর্থনীতির চালিকা শক্তি, তাই পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতেই এর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তা ছাড়া হুথিদের কাছে ভূখণ্ড হাতছাড়া হওয়ার অর্থ হলো হরমুজ প্রণালির সংকট অব্যাহত থাকা, যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত করবে। 

এই দ্বিতীয় দৃশ্যপটের ফল হবে একটি স্থবির অবস্থা বা অচলাবস্থা, যেখানে কেউ বিজয়ী নয়, কেউ পরাজিত নয়। তবে আড়ালে আসল লাভটা হবে ইরানের। 

লোহিত সাগর উপকূলে একটি ক্ষয়িষ্ণু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলতে থাকলে তেহরান সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ থেকে অনেকটাই হালকা হতে পারবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ের আলোচনায় ইরান ‘হুথি কার্ড’কে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে এবং নিজেদের শর্ত ও দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাবে। 

অতএব ইয়েমেন সংকটের একমাত্র সমাধান হলো- ইয়েমেন সরকারের নেতৃত্বে এবং একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোটের সমর্থনে একটি চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক সামরিক অভিযান। আর তা বাস্তবায়ন করতে হলে ইয়েমেন সরকারকে অবশ্যই সবার আগে নিজের ঘর সামলাতে হবে এবং তাদের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে হবে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সম্প্রতি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা যে হামলা চালিয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। 

বিশেষ করে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে চালানো এই আঘাত শুধু বেসামরিক বিমান চলাচল কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ওই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে- রিয়াদের এই হামলাকে শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কার শুরু হতে পারে। 

এ ঘটনার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে পাল্টা আক্রমণের মাত্রা, কূটনৈতিক উদ্যোগের সফলতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সংযমের ওপর। সৌদি আরব ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়িত থাকা, হুথিদের আধুনিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিলে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এতে একটি স্থানীয় সংঘাত খুব সহজেই সারা বিশ্বে প্রভাব ফেলছে। 

হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কৌশল রয়েছে। ইরানের জন্য সৌদি আরবের তেলব্যবস্থা এবং লোহিত সাগরে বিঘ্ন ঘটাতে পারা একটি রাজনৈতিক সুবিধা হতে পারে। কিন্তু এর ফলে যদি পুরো অঞ্চলে বড় যুদ্ধ বেধে যায়, তবে ইরানকেও তার মাশুল দিতে হবে। তাই ইরান কতটুকু সাহায্য করছে, তাদের প্রভাব কতটুকু এবং হুথিরা কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে- এই তিন বিষয় আলাদাভাবে বিচার করতে হবে। 

রিয়াদ, ইসলামাবাদ, আঙ্কারা ও কায়রোর এই যৌথ পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে পাকিস্তানের জন্য এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। কারণ, তাদের একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে নতুন কোনো বড় যুদ্ধে জড়ানো থেকে দূরে থাকতে হবে। সৌদি আরবের হুথিবিরোধী সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সংশয় নেই। রিয়াদ বিমান হামলা জোরদার করতে পারে, গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে পারে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে পারে। হুথিদের সামরিক অবকাঠামোর বড় ক্ষতি করার সামর্থ্যও তাদের আছে। 

প্রশ্ন হলো- তাতে কি হুথি সমস্যার সমাধান হবে? ব্যাপক সামরিক অভিযান হুথিদের উৎক্ষেপণস্থল ও কমান্ড অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে সৌদি তেল স্থাপনা, শহর, বন্দর ও জাহাজ চলাচলে হামলা বাড়তে পারে। আবার রিয়াদ সংযত থাকলে হুথিরা বাব আল-মানদেব ঘিরে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে। সৌদি আরবের সংকট এখানেই- সংযম ও সংঘাত বৃদ্ধি, দুই পথেই ঝুঁকি আছে। 

এই প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্পের কাছে রিয়াদের সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি দেখতে হবে। যুবরাজ সালমান সম্ভবত ওয়াশিংটনকে সৌদি আরবের হয়ে যুদ্ধে নামানোর চেয়ে মার্কিন সামরিক শক্তিকে প্রতিরোধের সমীকরণে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরাসরি হামলায় ট্রাম্পের অসম্মতি একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে- সৌদি আরবের প্রতিটি নিরাপত্তা সংকটের ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্র নেবে, এমন নিশ্চয়তা আর নেই। 

হুথিদের শক্তির জায়গাটিও এখানে। অর্থ, অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতায় তারা সৌদি আরবের ধারেকাছেও নেই। কিন্তু অসম যুদ্ধের সুবিধা তাদের পক্ষে। একটি সস্তা ড্রোন ঠেকাতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হয়। একটি পাইপলাইনে সফল হামলাই বিপুল তেল রপ্তানি ব্যাহত করতে পারে। কোনো ট্যাংকার না ডুবিয়েও জাহাজে হামলার বিশ্বাসযোগ্য হুমকি বিমার খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। আর বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সাময়িকভাবে অচল হলে তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববাণিজ্যে। তাই হুথিদের হুমকি তাদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড কিংবা অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে মাপলে ভুল হবে। 

আসল বিষয় হলো- তারা কত কম খরচে সৌদি আরব ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর কত বড় কৌশলগত অনিশ্চয়তা চাপিয়ে দিতে পারে। হুথিরা সৌদি আরবের এমন এক দুর্বলতা সামনে এনেছে, যার সমাধান শুধু অর্থ, অস্ত্র কিংবা উন্নত সামরিক প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে অনেক লড়াইয়ে জিততে পারে। কিন্তু সংঘাতের কৌশলগত সমীকরণ বদলাতে না পারলে হুথিদের হয়তো যুদ্ধে জেতার প্রয়োজনই হবে না।

লেখক: কলামিস্ট, লন্ডন থেকে 

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close