জাপান প্রযুক্তির দেশ। এ কথাটি আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে কার অজানা। কিন্তু আজকের এই লেখায় আমি সেই পরিচিত প্রশংসার গল্পটি বলতে চাই না। আমি একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে রাখতে চাই যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিকসে জাপানের প্রযুক্তিগুলো কেবল প্রদর্শনী নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে বাস্তব মাঠে ব্যবহৃত হয়ে প্রমাণিত হয়ে গেছে।
আমার বিষয় হচ্ছে, তার মধ্যে ঠিক কোনটি বাংলাদেশে এনে কাজে লাগানো যায়? এখানে আসল ব্যাপার টি হলো, জাপানের প্রযুক্তি দেখে মুগ্ধ হওয়া সহজ, কিন্তু নিজের দেশের বাস্তবতায় সেটি বসানো বা কাজে লাগানো কঠিন। আমি বিষয়টি নিয়ে কিছুদিন ধরে খোঁজ নিচ্ছি, এবং যা পেয়েছি তা কিছুটা অপ্রত্যাশিত।
শুরুতেই একটি কথা বলে রাখা দরকার, নইলে পুরো আলোচনাটি ভুল পথে যাবে। জাপান কেন কৃষিকাজে এত দ্রুত অগ্রগতি আনল। তার কারণ প্রযুক্তিপ্রীতি নয়, কারণটি নিতান্ত বাধ্যবাধকতা। দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের জরিপ অনুযায়ী জাপানে মূল কৃষিশ্রমিকের সংখ্যা নেমে এসেছে ৯ লাখ ৮৬ হাজার ৬০০ জনে। যা ১৯৮৫ সালের পর এই প্রথম দশ লাখের নিচে নামল। এক গবেষণার ফলে দেখা যায় তাদের গড় বয়স এখন ৬৭.৭ বছর। সত্তর বছর বা তার বেশি বয়সীরাই এই শ্রমশক্তির ৫৬.৫ শতাংশ, আর ত্রিশ বছরের কম বয়সী আছেন মাত্র ১.২ শতাংশ। অর্থাৎ জাপান কৃষিযন্ত্র বানিয়েছে কারণ তাদের কৃষক ফুরিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের অবস্থা ঠিক উল্টো। বাংলাদেশে কৃষি জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ জোগায়, অথচ শ্রমশক্তির ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ মানুষ এই খাতেই যুক্ত, আর প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরাই কৃষক সমাজের প্রায় ৮৩ শতাংশ, যাদের অধিকাংশের জমি দেড় একরেরও কম। অতএব আমি মনে করি, জাপানের যন্ত্র হুবহু এনে এখানে বসিয়ে দেওয়ার সুযোগ আমাদের একেবারে নেই। আমাদের অনুসরণ করতে হবে তাদের যন্ত্র নয়, বরং তাদের পদ্ধতি। এই পার্থক্যটুকু মাথায় রেখেই এবার আমি একটি উদাহরণ দিয়ে শুরু করব।
জাপানের সবচেয়ে প্রমাণিত কৃষি-রোবটটি কোনো বৈজ্ঞানিক ট্রাক্টর নয়। বরং রোবটটি আকাশে উড়তে পারে। ইয়ামাহা আশির দশকে শ্রমিক সংকট ও হাতে ছিটানো কীটনাশকের ক্ষতি, এই দুই সমস্যার সমাধান খুঁজতে চালকবিহীন হেলিকপ্টার বানানো শুরু করে। এক সূত্রে বলা হয়েছে প্রথম যন্ত্রটি সরবরাহ করা হয় ১৯৯০ সালে, আর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয় ১৯৯১ সালে। এরপর যা ঘটেছে তা-ই আসল খবর: ২০১৬ সালের মার্চ নাগাদ জাপানের কৃষিতে প্রায় ২,৮০০টি চালকবিহীন হেলিকপ্টার নিবন্ধিত ছিল, যেগুলো বছরে প্রায় ১০ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে ওষুধ ছিটাত, অর্থাৎ জাপানের মোট ধানি জমির প্রায় ৩৬ শতাংশ। ধান ছাড়িয়ে এর ব্যবহার ছড়িয়েছে গম, সয়াবিন, মুলা, ফলের বাগান ও সবজিতে।
এই প্রযুক্তিটি টানা পঁয়ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে ছোট্ট করে একটি হিসাব বলে রাখা উচিত। ড্রোনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটানোর খরচ কমে যায় জমির পরিমাণ বাড়লে, আর গবেষণায় দেখা যাচ্ছে একটি যন্ত্র বছরে ২০০ হেক্টর পর্যন্ত জমি সামলাতে পারে। যাহোক, এখানে ৩০ হেক্টরের একটি খামারে হিসাব করে দেখা গেছে, প্রচলিত পাওয়ার স্প্রেয়ারে হেক্টরপ্রতি খরচ ড্রোনের চেয়ে প্রায় ৮৬৫ ইয়েন বেশি পড়ে।
যাহোক, লক্ষ করলে দেখা যায়, খরচ কমার জন্য কৃষককে বড় হতে হয় না, বড় হতে হয় সেবার পরিধিকে। একজন সেবাদাতা যদি বহু ছোট ছোট জমি ঘুরে কাজ করেন, তিনি একই সুবিধা পান। আর ইয়ামাহার যন্ত্রগুলো জাপানে কৃষকদের কাছে বিক্রি হয়নি, চলেছে সমবায়ভিত্তিক সেবাদাতাদের হাত ধরে; কৃষক যন্ত্র কেনেননি, কৃষক ওষুধ ছিটানোর সেবা কিনেছেন।
দ্বিতীয় প্রযুক্তিটি আরও সস্তা। আর আমার বিবেচনায় এটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে ব্যাবহারযোগ্য। জাপানে ধানের জমিতে পানির স্তর মাপার সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় গেট ব্যবহার করে সেচের পানি সাশ্রয়ের যে পরীক্ষা হয়েছে, তাতে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় পানি খরচ ৩৩.৭ শতাংশ থেকে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। যন্ত্রটি জটিল নয়, এটি হলো পানির গভীরতা মাপার একটি সেন্সর, একটি গেট আর একটি ছোট মোটর। যন্ত্রটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থাগুলো খরচ কমাতে ইচ্ছে করেই কেবল পানির স্তর ও তাপমাত্রা মাপে, তার বেশি কিছু নয়।
এখন আমি যে কথাটি বলতে চাই, সেটি জাপান নিয়ে নয়, আমাদের নিয়ে। পানি বাঁচানোর এই চাষপদ্ধতি, যাকে আমরা বলি পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো, বাংলাদেশে আগেই প্রমাণিত হয়ে গেছে। ময়মনসিংহ ও শেরপুরের ৮০ জন কৃষকের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে এতে পানি খরচ ৩৭ শতাংশ কমে এবং পানির উৎপাদনশীলতা ৬৫ শতাংশ বাড়ে।
গাজীপুর, কুষ্টিয়া, রংপুর ও ফেনীর মাঠ পরীক্ষায় পানি সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ, আর সেচের খরচ কমেছে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো, এই পদ্ধতিতে কৃষককে বারবার জমিতে গিয়ে পাইপের ভেতরে পানির স্তর দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অর্থাৎ জাপান আমাদের কোনো নতুন চাষপদ্ধতি বিক্রি করছে না; জাপান বিক্রি করছে সেই সস্তা যন্ত্রটি, যা আমাদের ইতিমধ্যে প্রমাণিত পদ্ধতির একমাত্র বাধাটি সরিয়ে দেয়।
আর এই কাজটি জরুরি, কারণ আমাদের হাতে সময় বেশি নেই। উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১৯৮১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ৪ থেকে ১২ মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে। আর আমাদের সেচের প্রায় ৭৮ শতাংশ পানিই আসে ভূগর্ভ থেকে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়েছে যে ২০২৬ সালের এপ্রিলে সরকারকে বোরো চাষ কমানোর পরামর্শ দিয়ে সার্কুলার জারি করতে হয়েছে, যা নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের সাথে অসন্তোষও তৈরি হয়েছে।
আমি মনে করি, যে প্রযুক্তি এক-তৃতীয়াংশ সেচের পানি বাঁচায় এবং যার দাম কয়েক হাজার টাকা, তাকে অগ্রাধিকার না দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। বিশেষ করে যেখানে সেচের বিদ্যুৎ বা জ্বালানির একটি বড় অংশের বোঝা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।
তৃতীয় খাতটি আমাদের আলোচনায় প্রায় আসেই না। অথচ সেখানে সম্ভাবনা সবচেয়ে বড়। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম চাষের মাছ উৎপাদনকারী দেশ, বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন। কিন্তু সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যটি হলো, আমাদের মাছ চাষের ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশই এখনো সনাতন ও কম ফলনশীল পদ্ধতিতে হয়। জাপানে উমিট্রন নামের একটি প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত খাদ্য সরবরাহ যন্ত্র বানিয়েছে, যা মাছের খাওয়ার আচরণ দেখে খাবার দেওয়ার পরিমাণ ঠিক করে; জাপানে তাদের যন্ত্রগুলোর মধ্যে এআই-নিয়ন্ত্রিত খাওয়ানোর ব্যবহার ৫৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮ শতাংশে উঠেছে, আর বিশ্বের বৃহত্তম মৎস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিও এটি ব্যবহার করছে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে এই পদ্ধতিতে খাদ্যের খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমে। মাছ চাষে খাদ্যই সবচেয়ে বড় খরচ, তাই এই সংখ্যাটি ছোট নয়। তবে সততার খাতিরে বলি, তাদের যন্ত্র তৈরি সমুদ্রের খাঁচায় উচ্চমূল্যের মাছের জন্য, আর আমাদের বেশির ভাগ চাষ হয় পুকুরে রুই-তেলাপিয়া-পাঙাশে; তাই যন্ত্রটি নয়, এর পেছনের নীতিটি, অর্থাৎ ঘড়ি ধরে নয় বরং মাছের ক্ষুধা মেপে খাবার দেওয়া, সেটিই আমাদের নিতে হবে অনেক কম খরচে।
আরও দুটি প্রয়োগের কথা সংক্ষেপে বলি। জাপানে গবাদিপশুর প্রসব আগেভাগে জানার জন্য ক্যামেরাভিত্তিক ব্যবস্থা নিয়ে ৩১টি বাণিজ্যিক খামারে পরীক্ষা হয়েছে। যেখানে ৩৫৭টি ঘটনার মধ্যে ৩৩৬টি আগেই শনাক্ত হয়েছে, অর্থাৎ ৯৪.১ শতাংশ, আর গড়ে ১৪২ মিনিট আগে সতর্কবার্তা মিলেছে। এখানে একটি সীমাবদ্ধতাও খোলাখুলি বলা দরকার। প্রতি দশটি সতর্কবার্তার প্রায় তিনটি ছিল মিথ্যা। তবু হিসাবটি কৃষকের পক্ষেই যায়, কারণ মিথ্যা সংকেতে গোয়ালঘরে একবার যেতে হয় মাত্র, আর সত্যিকারের প্রসব ধরতে না পারলে গাভি ও বাছুর দুটোই মারা যেতে পারে।
এরপর রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়। ২০২৪ সালে নোতো ভূমিকম্পের পর জাপানে ড্রোন ব্যবহার হয়েছে ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত মূল্যায়ন, ত্রাণ পৌঁছানো ও যোগাযোগ সচল রাখার কাজে, আর গবেষকেরা বলছেন হেলিকপ্টারের তুলনায় ড্রোন প্রস্তুত করতে অনেক কম সময় লাগে। আমি মনে করি আমাদের বদ্বীপের দেশে এই সুবিধাটি আলাদা মূল্য রাখে।
এবার সেই যন্ত্রটির কথা, যেটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত অথচ আমাদের জন্য সবচেয়ে কম প্রাসঙ্গিক। কুবোটা ২০২৭ সালের এপ্রিলে চালকবিহীন ট্রাক্টর আনছে। যাতে আছে পাঁচটি এআই ক্যামেরা ও পাঁচটি রাডার। যন্ত্রটি চমৎকার, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি স্পষ্ট বলেছে জাপানের বাইরে এটি বিক্রির কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। আর এটি তৈরি হয়েছে বড় ও সংহত জমির জন্য। অতএব এটি আমাদের জন্য নয়, এবং সেটি স্বীকার করে নেওয়াই সৎ কাজ।
এখানে আমি একটি কথা বলতে চাই, যা যন্ত্রের বা রোবটের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানে যন্ত্র ছড়িয়েছে ব্যক্তিগত কেনাকাটার মাধ্যমে নয়, সমবায়ের মাধ্যমে। দেশটিতে ৬৯৪টি আঞ্চলিক কৃষি সমবায় কার্যত সব কৃষককে একসাথে বেঁধে রেখেছে। যারা উপকরণ সরবরাহ থেকে বিপণন ও ঋণ পর্যন্ত সবই সামলায়, আর স্থানীয় পর্যায়ে এই সমবায়গুলো যেখানে যৌথ ব্যবস্থাপনা গড়েছে সেখানে সবচেয়ে বেশি যে কাজটি হয়েছে তা হলো যন্ত্রের যৌথ মালিকানা। অর্থাৎ জাপান ক্ষুদ্র কৃষকের যন্ত্র-সমস্যার সমাধান করেছে একটি প্রতিষ্ঠান দিয়ে, সস্তা যন্ত্র দিয়ে নয়। আমাদের গ্রামে ধান মাড়াইয়ের যন্ত্র বা পাওয়ার টিলার ইতিমধ্যেই ভাগাভাগি করে ব্যবহৃত হয়। এই সামাজিক অভ্যাসটি আমাদের আছে। যেটি নেই তা হলো এই ভাগাভাগিকে একটি নিয়মিত ও জবাবদিহিমূলক সেবায় রূপ দেওয়ার কাঠামো।
এখানে অনেকের মনে একটি স্বাভাবিক আশঙ্কা আসতে পারে, এবং আশঙ্কাটি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। যে দেশের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ মানুষ কৃষিতে কাজ করেন, সেখানে রোবটের কথা বললে প্রথম প্রশ্নটিই আসে, তাহলে এত মানুষ কী করবেন? কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমি যেসব প্রয়োগের কথা বললাম তার বেশির ভাগই শ্রম সরায় না, তথ্য যোগ করে। পানির স্তর মাপার সেন্সর কারও কাজ কাড়ে না, বরং সেচের বিল কমায়। গাভির প্রসবের সংকেত খামারিকে ঘুমাতে দেয় এবং বাছুর বাঁচায়। আর ড্রোনে ওষুধ ছিটানোর সেবা নতুন কাজ তৈরি করে, কারণ যন্ত্র চালাতে, মেরামত করতে ও ভাড়া দিতে মানুষ লাগে। অতএব প্রশ্নটি যন্ত্র আসবে কি না তা নয়; প্রশ্নটি হলো কোন যন্ত্র আমরা আগে আনব।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকেও একটি শিক্ষা আছে, যা আমাকে ভাবিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে ডিজিটাল কৃষিপ্রযুক্তি গ্রহণ নিয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে, সেখানে বারবার একটি বিষয় উঠে এসেছে: যন্ত্রের মান নয়, বরং কৃষকের সাথে সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও গবেষকদের নিয়মিত যোগাযোগই নির্ধারণ করে প্রযুক্তিটি গৃহীত হবে কি না। অর্থাৎ আমরা যদি যন্ত্র আমদানি করি কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণে বিনিয়োগ না করি, তাহলে যন্ত্রগুলো গুদামেই পড়ে থাকবে। এটি তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়, এটি আমরা আগেও দেখেছি।
এই সবকিছু মিলিয়ে আমি সরকারের বিবেচনার জন্য পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রস্তাব করতে চাই। এক, ড্রোনে ওষুধ ও সার ছিটানোর সেবা, কেনার মডেলে নয়, ভাড়ার মডেলে। দুই, ধানের জমিতে পানির স্তর মাপার সেন্সর, যা আমাদের ইতিমধ্যে প্রমাণিত সেচপদ্ধতিকে সহজ করে দেবে। তিন, মাছ চাষে ক্ষুধা মেপে খাবার দেওয়ার সস্তা ব্যবস্থা। চার, প্রাণিসম্পদে স্বাস্থ্য ও প্রসব পর্যবেক্ষণ। আর পাঁচ, দুর্যোগ পূর্বাভাস ও উদ্ধারে ড্রোন।
লক্ষ করুন, এই পাঁচটির একটিও কোটি টাকার আমদানি নয়; প্রতিটির জন্য দরকার প্রশিক্ষণ, নিয়ম এবং একটি সেবাদানকারী কাঠামো। শুরু করার পদ্ধতি নিয়েও আমার একটি স্পষ্ট মত আছে। পাঁচটির প্রতিটির জন্য দুটি করে জেলা বেছে নিয়ে অন্তত দুই মৌসুম চালিয়ে দেখতে হবে, ফলাফল প্রকাশ করতে হবে, তারপর জাতীয় পর্যায়ে যেতে হবে। জাপানের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় শিক্ষাটিই এই ধৈর্য, আর এটিই আমাদের সবচেয়ে কম খরচের শিক্ষা।
সুখের কথা, এই পথটি একেবারে অচেনা নয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ও জাপান কৃষি গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, যন্ত্রায়ণ এবং ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তি গ্রহণে সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আলোচনা আছে এবং কাঠামোও আছে; যেটি দরকার তা হলো আলোচনাকে একটি সুনির্দিষ্ট তালিকায় নামিয়ে আনা, যেখানে লেখা থাকবে কোন প্রযুক্তি, কোন খাতে, কোন জেলায়, কত সময়ে এবং কারা মাঠে পরীক্ষা করবে। এই পথে হাঁটলে কাজও তৈরি হবে, যেমন কৃষি-ড্রোন পাইলট, সেন্সর ও যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ টেকনিশিয়ান, এবং গ্রামপর্যায়ের যন্ত্রসেবা উদ্যোক্তা; এগুলো বিদেশে পাঠানোর কাজ নয়, গ্রামে থাকার কাজ। ৩১ দফার ৩০তম দফায় তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান নিয়ে যে অঙ্গীকার রয়েছে, এই তালিকাটি তার একটি বাস্তব রূপ হতে পারে।
বিষয়টিকে আমি একটি ছবির মধ্যে দাঁড় করাতে চাই। গাইবান্ধার একটি গ্রামে একজন তরুণ উদ্যোক্তা তাঁর ড্রোন নিয়ে ঘুরছেন, একদিনে বিশ-পঁচিশটি ছোট জমিতে ওষুধ ছিটিয়ে দিচ্ছেন, আর প্রতিটি কৃষক দাম দিচ্ছেন নিজের জমির মাপ অনুযায়ী; পাশের জমিতে কয়েক হাজার টাকার একটি সেন্সর কৃষককে জানিয়ে দিচ্ছে এখনো সেচ দেওয়ার দরকার নেই, ফলে তাঁর বিদ্যুৎ বিল কমছে আর নিচের পানি কিছুটা রক্ষা পাচ্ছে; আর গ্রামের পুকুরে খাবার পড়ছে মাছের ক্ষুধা বুঝে, ঘড়ি দেখে নয়। এর কোনোটির জন্যই আমাদের জাপান হয়ে যেতে হবে না; দরকার কেবল জাপানের পদ্ধতিটি বোঝা।
স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আশির দশকেই অনুধাবন করেছিলেন যে, বাইরের দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের কাজে লাগে কেবল তখনই, যখন তা আমাদের মাটির উপযোগী করে নেওয়া হয়। খাল খনন কর্মসূচি থেকে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা পর্যন্ত তার কাজের ধারাটি ছিল একই: প্রযুক্তি ও পরিশ্রমকে গ্রামের বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেওয়া। শহীদ জিয়ার আদৰ্শ ধরে এগিয়ে আসা আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ কর্মপরিকল্পনায় একটি সুসংহত রূপ পেয়েছে। ৩১ দফা একটি সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ, আর বিদেশি প্রমাণিত প্রযুক্তিকে দেশীয় বাস্তবতায় বসানোর এই কাজটি সেই রোডম্যাপেরই একটি অধ্যায়।
আমাদের লক্ষ্য একটি স্বনির্ভর, টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ অন্যের সাফল্য দেখে কেবল মুগ্ধ হবে না, বরং সেই সাফল্যের পেছনের পদ্ধতিটি শিখে নিজের মাটিতে নিজের সমাধান গড়ে তুলবে। পরবর্তীতে ফসল তোলার পরের অপচয় কমানোর প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করব বলে আশা রাখছি। ধন্যবাদ সবাইকে।
তথ্যসূত্র:
১. জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের জরিপের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন। nippon.com/en/japan-data/h02834
২. বাংলাদেশের কৃষি খাতের জিডিপি অংশ, শ্রমশক্তি ও ক্ষুদ্র কৃষক সংক্রান্ত পর্যালোচনা, ২০২৬। lightcastlepartners.com/insights/2026/07/agriculture-budget-2026-27-beyond-subsidies
৩. ইয়ামাহা মোটরের চালকবিহীন হেলিকপ্টার: উন্নয়নের ইতিহাস, জাপানে নিবন্ধিত সংখ্যা ও ছিটানো জমির পরিমাণ, এবং সমবায়ভিত্তিক সেবার মডেল। global.yamaha-motor.com/stories/history/stories/0028.html
৪. এগ্রিকালচারাল ড্রোন স্প্রেয়ারের খরচ ও কর্মভার মূল্যায়ন: জাপানে ধান উৎপাদনের কেস স্টাডি, সাসটেইনেবিলিটি, ২০২২। mdpi.com/2071-1050/14/17/10850
৫. ধান চাষে স্বয়ংক্রিয় সেচ ব্যবস্থার মূল্যায়ন, সাসটেইনেবিলিটি, ২০২১। mdpi.com/2071-1050/14/17/11044
৬. বোরো ধানে পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতির তুলনামূলক গবেষণা, স্প্রিঙ্গার, ২০২৫। link.springer.com/article/10.1007/s44279-025-00356-8
৭. বাংলাদেশে বোরো চাষে পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রভাব মূল্যায়ন। researchgate.net/publication/338822857
৮. উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমের সেচে ভূগর্ভস্থ পানির টেকসইতা। academia.edu/113439653
৯. মঙ্গাবে, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে বাংলাদেশের টানাপোড়েন, এপ্রিল ২০২৬। news.mongabay.com/2026/04/bangladesh-struggles-to-choose-between-food-security-stable-groundwater-table
১০. এফএওর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদন ও চাষপদ্ধতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন। dhakastream.net/bangladesh/bangladesh-holds-2nd-place-worldwide-inland-fish-production-fao-196092
১১. উমিট্রনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত মাছের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রতিবেদন। globalseafood.org/advocate/artificial-intelligence-is-taking-fish-farming-and-sushi-in-japan-to-greater-heights
১২. নাবেনিশি ও সহলেখকেরা, অ্যানিমেল সায়েন্স জার্নাল, ২০২৬; বাণিজ্যিক খামারে ক্যামেরাভিত্তিক প্রসব শনাক্তকরণের মাঠ যাচাই। onlinelibrary.wiley.com/doi/10.1111/asj.70218
১৩. ২০২৪ সালের নোতো ভূমিকম্পে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে পর্যালোচনা। sciencedirect.com/science/article/pii/S2590061724000383
১৪. কুবোটা, অ্যাগ্রি রোবো ট্রাক্টর এমআর সিরিজ সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, ৬ আগস্ট ২০২৬। kubota.com/news/2026/20260806-001252.html
১৫. জাপান এগ্রিকালচারাল কোঅপারেটিভস এবং যন্ত্রের যৌথ মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য। en.wikipedia.org/wiki/Japan_Agricultural_Cooperatives
১৬. ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে ডিজিটাল কৃষিপ্রযুক্তি গ্রহণ সংক্রান্ত গবেষণা। sciencedirect.com/science/article/abs/pii/S2452292925000360
১৭. বাংলাদেশ ও জাপানের কৃষি সহযোগিতা সংক্রান্ত আলোচনা, এপ্রিল ২০২৬। jagonews24.com/en/national/news/92283
লেখক: প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স এন্ড অ্যাপ্লাইড এআই,
উপপরিচালক, সেন্টার ফর অ্যাপ্লাইড এন্ড রেস্পন্সিবল এআই,
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রূপের সদস্য।
কেকে/ এমএস