পাহাড়, নদী, সাদামাটির টিলা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আর বিস্তীর্ণ হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ নেত্রকোনা। জেলার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরীতে রয়েছে পর্যটনশিল্প বিকাশের বিপুল সম্ভাবনা। যথাযথ পরিকল্পনা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এসব এলাকা হয়ে উঠতে পারে নতুন পর্যটনকেন্দ্র। সৃষ্টি হতে পারে কর্মসংস্থান, বাড়তে পারে স্থানীয় মানুষের আয়। তবে অবকাঠামোর ঘাটতি, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না এই সম্ভাবনা।
দুর্গাপুরে পাহাড়, নদী ও ঐতিহ্যের হাতছানি
দুর্গাপুরের অন্যতম আকর্ষণ বিজয়পুরের সাদামাটির পাহাড় ও নীল পানির লেক। এ ছাড়া সোমেশ্বরী নদী, গারো পাহাড়ের পাদদেশ, বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি, সুসং রাজবাড়ি, রানীখং মিশন, কমলা রানীর দিঘি ও হাজং মাতা রাশিমণির স্মৃতিসৌধ পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
পাহাড়ি পরিবেশ, নদী ও স্থানীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে দুর্গাপুরে প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের পাশাপাশি ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন বিকাশের সুযোগ রয়েছে। তবে সাদামাটি উত্তোলন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন পরিবর্তন এবং সোমেশ্বরী নদীতে অপরিকল্পিত বালু-পাথর উত্তোলন পরিবেশের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি এসব প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কলমাকান্দায় পাহাড় ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন
ভারতের মেঘালয় পাহাড়সংলগ্ন কলমাকান্দার রংছাতি, লেংগুরা ও খারনৈ ইউনিয়নে রয়েছে পাহাড়ি জনপদ ও সবুজ প্রকৃতি। পাঁচগাঁও গ্রামের চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়, লেংগুরা টিলা, পাতলা বন এবং ফুলবাড়ী এলাকার সাত শহীদের সমাধি এ উপজেলার উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ।
১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই নাজিরপুর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও যথাযথ তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব।
এ ছাড়া পাঁচগাঁও চন্দ্রডিঙ্গা পর্যটনকেন্দ্রের জন্য নির্মিত অবকাঠামো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে এসব স্থাপনা পর্যটন বিকাশে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারবে না।
খালিয়াজুরীতে হাওরকেন্দ্রিক পর্যটনের সুযোগ
নেত্রকোনার হাওরবেষ্টিত খালিয়াজুরী বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক রূপ ধারণ করে। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌভ্রমণ ও সূর্যাস্তের দৃশ্য যেমন পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে, তেমনি হেমন্তে ধানখেত এবং শীতকালে অতিথি পাখি দেখার সুযোগও রয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৯৭ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলায় ১৩৪টি হাওরের মোট আয়তন প্রায় ২৩ হাজার ২৮০ হেক্টর। ধনু ও ধলাই নদীর পাশাপাশি হেমনগর, কীর্তনখোলা, গোবিন্দডোবা, লক্ষ্মীপুর ও লেপসিয়াসহ বিভিন্ন হাওর এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ।
হেমনগর কান্দায় ২৬ একর খাসজমিতে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও সরকারি প্রকাশনায় উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রকল্পটির বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই। পাঁচহাট জামে মসজিদ ও চানপুর হাসার আখড়ার মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও এ অঞ্চলে পর্যটনের নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো বড় বাধা
তিন উপজেলার পর্যটন বিকাশে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা যাতায়াতব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব। অনেক দর্শনীয় স্থানে সড়কের মান, পরিবহন, নদী পারাপার ও পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সেবার ঘাটতি রয়েছে। মানসম্মত আবাসন, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, খাবারের ব্যবস্থা, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র, পার্কিং ও জরুরি চিকিৎসাসেবাও পর্যাপ্ত নয়।
খালিয়াজুরীতে যোগাযোগসংকট আরও প্রকট। উপজেলা পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে মোট সড়কের দৈর্ঘ্য ৪২৯ কিলোমিটার হলেও পাকা সড়ক মাত্র ৪ কিলোমিটার। ফলে সড়কের পাশাপাশি নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিরাপদ নৌযান, নির্দিষ্ট নৌরুট, পর্যাপ্ত ঘাট ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করা ছাড়া বড় পরিসরে পর্যটন পরিচালনা কঠিন।
পরিবেশগত ঝুঁকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পাহাড় কাটা, নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং হাওরে অতিরিক্ত শব্দ ও অনিয়ন্ত্রিত নৌযান প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
পর্যটন বাড়াতে পারে স্থানীয় কর্মসংস্থান
পরিকল্পিত পর্যটন চালু হলে তিন উপজেলার অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। দুর্গাপুরে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ট্যুর গাইড ও হস্তশিল্পের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। কলমাকান্দায় পাহাড়কেন্দ্রিক পর্যটন, স্থানীয় গাইড, খাবারের দোকান ও ক্ষুদ্র আবাসন ব্যবসা গড়ে উঠতে পারে। খালিয়াজুরীতে নৌভ্রমণ, স্থানীয় খাবার, মাছ ও কৃষিপণ্য বিপণন এবং হাওরকেন্দ্রিক আবাসন নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত করা গেলে এলাকার মানুষের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসারও প্রসার ঘটতে পারে।
দুর্গাপুর ও কলমাকান্দায় আধুনিক পর্যটন মডেল স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন জেলা প্রশাসকের কাছে তথ্য চেয়েছে। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের উদ্যোগে নেওয়া এ প্রক্রিয়ায় প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য অন্তত ২০ একর জমি নির্বাচনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের মতে, জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পর্যটনমুখী এলাকাগুলোতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে নেত্রকোনা নতুন পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে।
প্রয়োজন সমন্বিত মহাপরিকল্পনা
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরীর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। দুর্গাপুরে পাহাড়, নদী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য; কলমাকান্দায় পাহাড়, বনভূমি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন; আর খালিয়াজুরীতে হাওর ও জীববৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে পৃথক পর্যটন মডেল গড়ে তোলা যেতে পারে।
এ জন্য নিরাপদ যাতায়াত, নৌপথের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জরুরি চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত পর্যটনসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করতে হবে। বড় অবকাঠামো নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করাও জরুরি।
নেত্রকোনার পাহাড়, নদী ও হাওরের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য পর্যটনশিল্পের বড় সম্পদ। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, কার্যকর পরিকল্পনা এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরী হয়ে উঠতে পারে জেলার পর্যটন অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের নতুন কেন্দ্র।
কেকে/সাশ