গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নানা অপতৎপরতা শুরু করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা।
বিদেশ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলছে যোগাযোগ। ঝটিকা মিছিলে ‘লাঠি-বৈঠা’ নিয়ে মাঠে নামছে। দু-একটি স্থানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া ককটেল বিস্ফোরণে জনমনে তৈরি করা হচ্ছে আতঙ্কের পরিবেশ। সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে চালানো দলটির নানা কার্যক্রম, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক সূত্রে এসব তথ্য সামনে এসেছে।
এসব ঘটনার বিষয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানে পরাজিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দিনক্ষণ সামনে রেখেই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। তারা পুলিশ-প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
তবে হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন নিয়ে বর্তমান সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রেখেছে সংশ্লিষ্ট বাহিনী। এ বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
শেখ হাসিনা সম্প্রতি এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে তিনি বাংলাদেশে ফিরতে প্রস্তুত, যদিও সেখানে তার জন্য গ্রেপ্তার বা আইনি ঝুঁকির সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। তার দেশে ফেরার ঘোষণার পর থেকেই গোপনে সংগঠিত হতে থাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ডিসেম্বরকে টার্গেট করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তারা নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।
গত শনিবার গোপালগঞ্জে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের মিছিল থেকে পুলিশের গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। এ সময় পুলিশের তিন সদস্যকে মারধর করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ‘জয় বাংলা’ ও ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’—এ ধরনের বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে একদল যুবক মিছিল করে। তাদের হাতে হকিস্টিক ও লাঠিসোঁটা দেখা যায়।
একই দিন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানা হাজতে থাকা অবস্থায় নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা শাহ তপুর ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া গত শুক্রবার কুমিল্লা নগরে ‘শেখ হাসিনা আইতাছে’ স্লোগান দিয়ে ঝটিকা মিছিল করেছেন ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। এ ঘটনার পর ১৭ জনকে আটক করে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ভিডিওতে মিছিলকারীদের নানা স্লোগান দিতে শোনা যায়। তাদের কয়েকজনের হাতে লাঠি এবং মুখে মাস্ক দেখা যায়। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে গত রোববার ভোরে মিছিল করেছে ছাত্রলীগ।
২২ অক্টোবর নওগাঁর মান্দা উপজেলায় অটোরিকশায় মাইকে প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে প্রচার চালানোর একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ২০ অক্টোবর ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে লাঠি ও বৈঠা হাতে বিক্ষোভ মিছিল করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এদিকে গত শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে রাজধানীর পুরাতন রমনা থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যার পর রমনা পুরান থানার সামনে হঠাৎ মোটরসাইকেলে দুজন এসে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায়।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনে গত ২০ সেপ্টেম্বর ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার প্রধান আসামি আবুল হায়াত দিপুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ডিএমপি জানায়, গ্রেপ্তার আবুল হায়াত দিপু নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি সংগঠনের সদস্য।
মোহাম্মদপুর থেকে আ.লীগ নেতা গ্রেপ্তার :
গত রোববার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে আওয়ামী লীগ নেতা মো. আহাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ডিএমপি তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জুয়েল রানা জানান, আহাদ হোসেন ভোলা সদর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র এবং পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
পুলিশের তথ্যমতে, আহাদ হোসেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রাখছিলেন। ঢাকায় অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি এবং আওয়ামী লীগের মিছিলের কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে তিনি ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
আ.লীগের গোপন বৈঠক :
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গোপন বৈঠক ও তৎপরতা ঘিরে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়েছে এবং বেশ কিছু নেতাকর্মীকে আটক করেছে। সেপ্টেম্বরে গাজীপুরে গোপনে দলীয় কমিটি পুনর্গঠনের চেষ্টার অভিযোগে আওয়ামী লীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুরোনো নেতাকর্মী, সাবেক জনপ্রতিনিধি ও অনুসারীদের মধ্যে ফোন এবং সামাজিক মাধ্যমে ঘরোয়া যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
টেলিগ্রাম-হোয়াটসঅ্যাপে সক্রিয় :
দেশকে অকার্যকর ও অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গোপনে সংগঠিত হচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে গড়ে তোলা হয়েছে শতাধিক গোপন গ্রুপ, যেগুলো ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো। সবকিছুর নেতৃত্বে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ৩৭টি সক্রিয় টেলিগ্রাম ও ১৪টি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে নিয়মিতভাবে উসকানিমূলক বার্তা, রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার এবং সাংগঠনিক নির্দেশনা পাঠানো হচ্ছে। এসব গ্রুপে সরকারের নীতিনির্ধারণী কাঠামো, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, এ ডিজিটাল নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। এসব কার্যক্রমের অর্থায়ন ও নেতৃত্বে রয়েছেন প্রবাসী নেতারা, যাদের অতীতে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব ছিল।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে সুপরিকল্পিতভাবে গুজব ও আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর কোনো সুযোগ আমরা দেব না।
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরার গুঞ্জন প্রসঙ্গে একই কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গত রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দেশে কোনো অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না। কোনো অপশক্তি, পতিত শক্তি, ফ্যাসিস্ট, পলাতক অপরাধী কিংবা গণহত্যাকারীর অপতৎপরতা চলতে দেওয়া হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতীতের ফ্যাসিবাদী শক্তির এ ধরনের অপপ্রয়াস প্রথম থেকেই চালু ছিল। তারা বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায় এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ তাদের পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে বসে ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সতর্ক আছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অপকর্মের বিচার হবে আইন অনুযায়ী।
কেকে/ এমএস