জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে বিতর্ক যেন থামছেই না। বিশেষ করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দলটির বিতর্কিত ভূমিকা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী কর্মকাণ্ড নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে।
সর্বশেষ পিরোজপুরে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা প্রয়াত আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার সাক্ষী মানিক পশারীর দাফন ও গার্ড অব অনারে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বাধা দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কে মুখে পড়েছে দলটি।
এর আগে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরের সামনে গরু জবাইয়ের ঘটনা ও টঙ্গীতে মাদ্রাসা শিক্ষক কর্তৃক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন-হেনস্তার বিষয়েও নেপথ্যে দলটির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারকে বিপাকে ফেলতে ধারাবাহিকভাবে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে জামায়াত ও তার সহযোগীরা। তাদের মূল লক্ষ্য, দেশে যেন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করে এবং সরকার বিব্রত হয়।
এ বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল (জামায়াত) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই তার অনুসারী বা সহযোগী সংগঠনের ছত্রছায়ায় যদি ভীতি ও অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরি হয়, তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দেয়। কোনো রাজনৈতিক শক্তিরই ভয়ভীতি দেখিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ কিংবা সমাজে ত্রাসের পরিবেশ তৈরির অধিকার নেই।’
বিএনপি সরকারকে বিব্রত করতে জামায়াতের এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিকল্পিত বলেও মনে করেন তিনি।
এসব বিষয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা ও বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহেল রানাও। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন— পতিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে কেউ বিশৃঙ্খলা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা গণমাধ্যমকে কুক্ষিগত করে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরেছিলেন। তার দল আওয়ামী লীগ দেশকে বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিল। তাই পতিত দলটির সঙ্গে আঁতাত করে কেউ দেশে বিশৃঙ্খলা করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে সরকার।’
সোমবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যৌথসভা শেষে গণমাধ্যমে তিনি এসব কথা বলেন।
এদিকে সাঈদী পুত্র ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন যে, মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেয়নি জামায়াত। তিনি দীর্ঘ এক পোস্টে লিখেন, ‘লাশ দাফনে বা জানাজায় কোনো বাধা ছিল না, জনগণের আপত্তি ছিল ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানে— যা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবমাননা।’
এদিকে মাসুদ সাঈদী যে দাবি করেছেন, ‘মানিক পশারীর লাশ দাফনে বাধা ছিল না’, তা সত্য নয়। দ্য ডিসেন্ট নামক একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ফেসবুকে ভাইরাল একাধিক ভিডিওতে যারা ‘মানিক পশারীর দাফন পিরোজপুরে হতে দেওয়া হবে না’ মর্মে মিছিল ও বক্তব্য দিয়েছেন এবং ফেসবুকে ক্যাম্পেইন করেছেন তাদের অনেকেই স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মী।
এর বাইরেও মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাকে পিরোজপুরে দাফনের বিরোধিতা করে অনলাইনেও পোস্ট দিতে গেছে স্থানীয় জামায়ায়-শিবির সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইডি থেকে। যে আইডিগুলোতে জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন কার্যক্রমের ছবি ও ভিডিও পাওয়া যায়।
পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শিবিরের সভাপতি রেদওয়ান তার আইডিতে একটি ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন, ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা জারজ সন্তান মানিক পাশারীর লাশ দাফনে পিরোজপুর সদর ও জিয়ানগরে ব্যর্থ হয়ে এখন ধারণা করা হচ্ছে। এই কুলাঙ্গারের লাশ নাজিরপুরের কোথাও দাফন দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেখানেও সাঈদী প্রেমিকরা রাত জেগে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। কোনো এলাকাবাসী এ কুলাঙ্গারের লাশ দাফন করতে দিচ্ছে না।’
যদিও পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জহিরুল বলেছেন, ‘জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। সাঈদী প্রেমিক জনতা আবেগ ও ভালোবাসা থেকে এমনটি করে থাকতে পারেন। সেখানে কোনো দলীয় লোকজন থাকলেও থাকতে পারেন, তবে আমাদের কোনো নির্দেশনা ছিল না।’
তবে মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা। গতকাল সোমবার সকালে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করে প্রশ্ন তোলেন, বিরোধী দলে থাকতেই যারা এমন আচরণ করছে, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা হাতে পেলে তারা কী করবে।
জামায়াতের দ্বৈতনীতির সমালোচনা করে এ সাবেক এনসিপি নেত্রী লেখেন, জামায়াত নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের কথা বললেও অন্যদের ক্ষেত্রে তা মানতে নারাজ। পিরোজপুর জেলা জামায়াতের এক নেতার মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যা দেওয়ার প্রসঙ্গে তাসনিম বলেন, একাত্তরে যে দল স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারাই আজ ঠিক করে দিতে চাইছে কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া।
কোনো ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা কি না, তা যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও আদালত থাকলেও জামায়াত মাইক হাতে দাফন ঠেকিয়ে নিজেরাই এর মীমাংসা করতে চাইছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ ছাড়া মানিক পশারীর দাফন-জানাজায় বাধা প্রদানের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহেল রানা। গতকাল দুপুরে নিজের ফেসবুক পোস্টে এ ঘটনায় তিনি লেখেন, একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাকে কবর দেওয়ায় বাধা সৃষ্টি করল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং হারিকেন জ্বালিয়ে তার আলোতে আলোকিত করে তার কন্যাসন্তান নিজ হাতে মাটি খুঁড়ে বাবার কবর তৈরি করল।
সোহেল রানা আরও লেখেন, আগের কবরটি স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা মাটি দিয়ে ভরাট করে দিয়েছে। স্বাধীনতার স্বপক্ষীয় শক্তি নাকি বর্তমানে সরকার পরিচালনা করছে। কোন আলামত তো দেখা গেল না। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে সোহেল রানা লেখেন,‘সরকারের কাছে এর সঠিক জবাব চাই।’
কেকে/ এমএস