রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণসহ তিন দাবিতে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের পঞ্চম দিন চলছে। ২২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের কারণে বন্ধ রয়েছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালি।
তবে সব থেকে আতঙ্কের বিষয় হলো রাঙামাটির সাজেকে আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে কেন্দ্র করে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন সাজেক ছাড়িয়ে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ জনপদকে স্থবির করে দিয়েছে। টানা পাঁচদিন ধরে চলা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধে পরিবহন চলাচল বন্ধ, দূরপাল্লার বাস ছাড়ছে না, পাহাড়ি জনপদে বিরাজ করছে থমথমে আতঙ্ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বললেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ নেই।
অবরোধের সবচেয়ে বড় মাশুল গুনছেন সাধারণ মানুষ। সাজেক ও খাগড়াছড়ির প্রধান সড়কগুলোতে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে যান চলাচল ব্যাহত করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে পারছেন না। যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক দাবি আদায়ের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হওয়া উচিত, কিন্তু যে কর্মসূচি রোগীর চিকিৎসা ও মানুষের জীবিকার পথ রুদ্ধ করে, তার নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।
পর্যটন খাতের ক্ষতিও উদ্বেগজনক। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি সাজেকের ভরা মৌসুম, যে সময়ে শতাধিক কটেজের মালিকেরা প্রায় ৩০ কোটি টাকার ব্যবসা করেন এবং পর্যটকেরা প্রতিদিন রেস্তোরাঁয় ২২ থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করেন। এখন সব বুকিং বাতিল হয়েছে, প্রতিদিন চলাচলকারী ১০০ থেকে ১৫০টি জিপ বন্ধ। কটেজ মালিক, চালক, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবার জীবিকা আজ হুমকির মুখে। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতি কোটি কোটি টাকার লোকসানের কথা জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বিভিন্ন গোষ্ঠী ও ফ্র্যাকশনের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং পর্যটন মৌসুমে এলাকা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা থেকেই এ পরিস্থিতির উদ্ভব। তার মতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। চলাচল বন্ধ, পিকেটিং চলছে, আর অবরোধকারীদের একাংশ অভিযোগ করছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কর্মীদের বাধা দিয়েছে। অন্যদিকে অবরোধের অন্যতম দাবি জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরানো, যা সংগঠনটি অস্বীকার করেছে। পরস্পরবিরোধী এসব দাবি-পাল্টা দাবির মধ্যে সত্য নিরূপণ জরুরি, আর তা কেবল নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও আস্থাপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব।
এ প্রেক্ষাপটে আমরা মনে করি, সংকট নিরসনে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে নেওয়া প্রয়োজন: সব পক্ষকে নিয়ে অবিলম্বে সংলাপ শুরু করতে হবে। হেডম্যান, কারবারি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকে এতে যুক্ত করা জরুরি।
অবরোধকারীদের তিন দফা দাবি, বিশেষ করে সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতি-সংক্রান্ত অভিযোগ, নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকাশ্যে ফল জানাতে হবে। সড়ক অবরোধের সময়ও জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য ও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য নিরাপদ করিডর নিশ্চিত করতে হবে। সনিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা হতে হবে সংযত ও আইনানুগ। অবরোধকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ থাকলে তা খতিয়ে দেখতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে মৌসুম ফিরে পেলে তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তির স্বার্থে অতীতের চুক্তি ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সরকারকে আন্তরিক ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে। পাহাড়ের এই সংকট সমাধানে শক্তি প্রয়োগ বা কেবল আশ্বাসে হবে না। আস্থা ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই এ সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে আমাদের আহ্বান, মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে অবিলম্বে সংযম দেখান এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসুন।
কেকে/ এমএস