ইসরায়েলের নির্বাচনে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে নেমেছেন দেশটির দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়, যা চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও ডানপন্থী মিত্রদের সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। ডান ও মধ্যপন্থী ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন রয়েছে আইজেনকটের প্রতি।
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা নেতা নেতানিয়াহু প্রায় ১৯ বছর ক্ষমতায় রয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন। রোববার (২৫ অক্টোবর) নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইরানের হুমকি চূড়ান্তভাবে দূর করতে ট্রাম্প আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, তবে সে ক্ষেত্রে তাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে।
অন্যদিকে, আইজেনকট নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভয়ভীতি, মিথ্যা ও হুমকিনির্ভর প্রচারণার অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, ইসরায়েলের জনগণ যাকে নেতা নির্বাচিত করবে, ট্রাম্প তার সঙ্গেই সহযোগিতা করবেন।
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ৭৩ লাখ ভোটার ভোট দেওয়ার যোগ্য। তাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার ভোটার এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন।
৭ অক্টোবরের হামলার দায় নিয়ে বিতর্ক
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার প্রশ্ন। ওই হামলায় হামাসের নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর জবাবে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ইসরায়েলি হামলায় সেখানে ৭৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের অনেকে ওই দিনের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় নির্ধারণে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, জবাবদিহি নিশ্চিত করা ক্ষত কাটিয়ে ওঠার জন্য জরুরি। তবে নেতানিয়াহুর সমর্থকদের অনেকে তাঁর যুদ্ধ পরিচালনার প্রশংসা করছেন এবং তাকেই দেশের জন্য উপযুক্ত নেতা মনে করছেন।
সরকার গঠনে জোটের হিসাব
১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য নেতানিয়াহুকে আবারও কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের সমর্থন নিতে হতে পারে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে জনমত জরিপে বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টির সমর্থন বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এদিকে, ইরানের সামরিক পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন ঠেকানোকে পরবর্তী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে মনে করেন আইজেনকট। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জনের কথা বলেছেন তিনি।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতারও সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের পর এ ধরনের সহিংসতা বেড়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচারও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলছে। তিনি অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু ভোটারদের উপস্থিতি ও ভোটের হারও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করলেও বিশ্লেষকদের ধারণা, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে এসব দল তাঁর নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দিতে পারে।
নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট—কেউই সরকার গঠনের বিষয়ে নিশ্চিত অবস্থানে নেই। প্রয়োজনীয় জোট গঠনে ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর আবার নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো পক্ষেরই বড় ব্যবধানে জয়ের সম্ভাবনা কম; শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনে জোটের সমীকরণই নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ