২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের জ্বালানি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও শিল্প খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগে মূল বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) হলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটির বেশি। জনসংখ্যার মধ্যম বয়স ২৭ বছর। তরুণ ও প্রশিক্ষণযোগ্য কর্মশক্তি বাংলাদেশের বড় সম্পদ। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার শিক্ষার্থী প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল জনগোষ্ঠীর চাহিদা দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপান প্রথম দিকের স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর অন্যতম। স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে। দুই দেশের এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তর করতে চায় বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এ ধরনের প্রথম চুক্তি এটি। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় জাপানের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। একইভাবে ইস্পাত, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে। বিনিয়োগ, সেবা ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং শুল্ক ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। কিছু সমস্যা ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে, বাকি বিষয়গুলো সমাধানেও কাজ চলছে।
তারেক রহমান বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করলে বড় ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাবেন বিনিয়োগকারীরা। আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, বড় খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষিযন্ত্র উৎপাদনকারীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য তিনটি খাতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হলো জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা এবং উড়াল সড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক।
জ্বালানি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য শর্ত। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং অপরিহার্য প্রয়োজন। এ খাতে জ্বালানি অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে জাপানি কোম্পানিগুলোকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রযুক্তি ও মহাকাশ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবনভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ। এতে জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
মহাকাশ প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের উন্নত সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের মহাকাশ প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর আগ্রহ রয়েছে। এ বিষয়ে জাপানের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে তুলতে চায় সরকার।
পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়াল সড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে জাপানের সহযোগিতা চান তিনি। পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ ও অর্থায়নের জন্যও জাপানি অংশীদারদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দেশের শহর, গ্রাম, কারখানা ও বন্দরের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন। কার্যকর পরিবহন নেটওয়ার্ক পণ্য পরিবহনের ব্যয় ও সময় কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাবে। অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ককে আরও গভীর করতে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে যাচ্ছেন এবং দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। দেশে ফিরে তারা জাপানি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারেন।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এটি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি তরুণ জাপানি ভাষায় দক্ষ হয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করতে ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাপানি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণের সময় জাপান পাশে ছিল। এখন বাংলাদেশের শিল্প গড়ে তোলা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অংশীদার হওয়ার জন্য জাপানি ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসার সময়।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপান্তর করে দুই দেশের জনগণ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে চায় বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে উভয় দেশই সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
কেকে/সাশ