বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬,
১৩ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● তেল-গ্যাসে নাভিশ্বাস      ● ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন : শুরু হয়েছে ভোটগ্রহণ, লড়াইয়ে ৫ প্রার্থী      ● ঢাকাকে টোকিওর মতো পরিচ্ছন্ন শহরে রূপান্তর করতে চাই : প্রধানমন্ত্রী      ● জাপানের সঙ্গে ৭টি চুক্তি ও সমঝোতা সই বাংলাদেশের      ● বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী জাপান      ● ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের প্রাণহানি, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৮২      ● হাম উপসর্গে আরও ২ জনের মৃত্যু      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
যুদ্ধের ফাঁদে বাংলাদেশি তরুণেরা, সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে বাংলাদেশিরা ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বা নিখোঁজ হচ্ছেন। বিষয়টি এত দিন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান ও স্বজনদের আহাজারিতে সীমাবদ্ধ ছিল। এবার জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন বলেছে, বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিককে প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ বাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশিদের ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপিও কমিশনের হাতে এসেছে। এখন আর বিষয়টিকে অস্পষ্ট বা অপ্রমাণিত বলার সুযোগ নেই।

কমিশন ২৪৫টি সাক্ষ্য এবং ভিসা, বিমানের টিকিট, সামরিক চুক্তি ও রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনা করেছে। উচ্চ বেতন, নাগরিকত্ব ও পেনশনের লোভ দেখিয়ে বেসামরিক কাজের কথা বলে মানুষকে নেওয়া হয়েছে। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের চলাচলের স্বাধীনতা থাকেনি; অচেনা রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে সই করানো হয়েছে, অস্বীকার করলে জুটেছে হুমকি ও নির্যাতন। সামান্য প্রশিক্ষণের পরই তাদের পাঠানো হয়েছে সম্মুখযুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ। দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে এভাবে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া মানব পাচারেরই শামিল।

প্রতারণার জাল যে বহুমুখী, তা কমিশনের তথ্যে স্পষ্ট। দালালেরা কখনো ভ্রমণ প্রতিষ্ঠান সেজে, কখনো সরকারি অনুমোদনের নথি দেখিয়ে আস্থা অর্জন করেছেন। কাউকে ব্যবসায়িক ভিসায়, কাউকে স্বল্পমেয়াদি পর্যটন ভিসায় নেওয়া হয়েছে। অনেকে বেতন পাননি, কারও ব্যাংক হিসাব থেকে অনুমতি ছাড়া টাকা তোলা হয়েছে। যুদ্ধে যাওয়ার পর অনেকের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে ৩০ জনের একটি দলের কথাও আছে, যাদের যুদ্ধক্ষেত্রে না পাঠানোর নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল; তাদের ১৭ জন সামনের সারিতে নিহত হয়েছেন। তবে ওই দলের দেশের নাম বলা হয়নি।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশি নিয়োগপ্রাপ্তদের সংখ্যা, নাম বা পরিণতি নিয়ে আলাদা তথ্য নেই। এই শূন্যতা পূরণের দায়িত্ব সরকারের। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে গত তিন বছরে অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে; অনেকের লাশও দেশে ফেরেনি। যে রাষ্ট্র জানে না তার কত নাগরিক কোথায় আটকা পড়েছেন, সে তাদের উদ্ধারের কথা জোর দিয়ে বলতে পারে না। অন্যদিকে রাশিয়া কমিশনের এখতিয়ার স্বীকার করে না, তথ্যকে ভুয়া বলছে এবং কমিশনের ৪১টি লিখিত অনুরোধের জবাবও দেয়নি। তাই কেবল রুশ সদিচ্ছার ওপর ভরসা করা চলে না।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী বলেছেন, নিয়োগপত্র কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে এবং জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। এটি ইতিবাচক, কিন্তু বিবৃতিই যথেষ্ট নয়; দৃশ্যমান ফল দরকার। কেবল নিয়োগপত্র যাচাই করলে হবে না; কোন প্রতিষ্ঠান কী কাজের কথা বলে কর্মী নিচ্ছে এবং ভিসার ধরন কী, তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ ব্যবসায়িক ও পর্যটন ভিসার আড়ালেই মানুষকে যুদ্ধে নেওয়া হয়েছে। গবেষক সেলিম রেজার প্রশ্ন যথার্থ—জোর করে যুদ্ধে নেওয়ার তথ্য জানার পরও কেন রাশিয়ায় যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে?

এ অবস্থায় সরকারের জন্য কয়েকটি করণীয় জরুরি, স্বচ্ছ ও নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়ায় কর্মী পাঠানো স্থগিত করতে হবে। সাময়িক ক্ষতির চেয়ে মানুষের প্রাণ অনেক মূল্যবান। রাশিয়ায় যাওয়া, নিহত, নিখোঁজ, আহত ও বন্দি বাংলাদেশিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। এজন্য একটি বিশেষ সেল গঠন করে স্বজনদের অভিযোগ ও তথ্য নিতে হবে। 

মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাস ও উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে আটকে পড়া নাগরিকদের উদ্ধার, বাহিনী থেকে অব্যাহতি এবং মরদেহ ফেরত আনার চেষ্টা করতে হবে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামেও বিষয়টি তুলে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। দালাল ও অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রলোভনমূলক বিজ্ঞাপনও নজরদারিতে আনতে হবে। নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে আইনি ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে এবং ফিরে আসা ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশগামী তরুণদের সচেতন করতে স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে গ্রামে-গঞ্জে সতর্কবার্তা ছড়াতে হবে। একইসঙ্গে দেশে কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ শ্রমবাজার বাড়াতে হবে, কারণ কাজের অভাবই মানুষকে ঝুঁকির পথে ঠেলে দেয়। 

জাতিসংঘের প্রতিবেদন এ মানুষদের প্রতারণা ও জবরদস্তির শিকার বলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই স্বীকৃতির জোরেই সরকারের উচিত তাদের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে না পারে, প্রবাসী আয়ের গর্ব করার নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে। আর একটি প্রাণও যেন অন্যের যুদ্ধে ঝরে না যায়, সেই দায়িত্ব সরকারকে এখনই নিতে হবে।

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  যুদ্ধ   ফাঁদ   বাংলাদেশি   তরুণ   সরকার   দায়িত্বশীল   ভূমিকা   জরুরি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close