বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬,
১৩ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন : জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী বিএনপি প্রার্থী      ● তেল-গ্যাসে নাভিশ্বাস      ● ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন : শুরু হয়েছে ভোটগ্রহণ, লড়াইয়ে ৫ প্রার্থী      ● ঢাকাকে টোকিওর মতো পরিচ্ছন্ন শহরে রূপান্তর করতে চাই : প্রধানমন্ত্রী      ● জাপানের সঙ্গে ৭টি চুক্তি ও সমঝোতা সই বাংলাদেশের      ● বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী জাপান      ● ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের প্রাণহানি, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৮২      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন : বর্তমান পরিস্থিতি ও আগামীর সম্ভাবনা
আবু আফজাল সালেহ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪৬ এএম আপডেট: ২৯.১০.২০২৬ ১২:২৭ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং একটি উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ যেকোনো দেশের জন্য মৌলিক শর্ত। বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর সফল বাস্তবায়নের পর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। এই যাত্রায় দেশের জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাত পরস্পর পরিপূরক হিসেবে এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন শুধু সাময়িক কোনো অগ্রগতি নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তির জন্ম দিচ্ছে। জ্বালানি খাতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন এবং প্রযুক্তি খাতে উদ্ভাবনী মেধার বিকাশ ঘটাতে পারলে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ এবং একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো এর জ্বালানি খাত। বিগত দেড় দশকে এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠী এখন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। 

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে একটি বিশাল মাইলফলক। এটি দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী ও কার্বন-মুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহে ভূমিকা রাখবে। ক্রমবর্ধমান গ্যাস চাহিদা মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির জন্য মহেশখালী ও পায়রা এলএনজি টার্মিনাল ও অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। 

ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির মাধ্যমে গ্রিড কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ এখন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্লিন এনার্জির দিকে ঝুঁকছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ‘সোলার হোম সিস্টেম’ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে বাংলাদেশে। বর্তমানে অফ-গ্রিড চরাঞ্চলগুলোতে সোলার মিনি-গ্রিড আলো ছড়াচ্ছে। জলবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের পাশাপাশি শিল্পকারখানার ছাদে রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপন এবং জলাশয়ে ভাসমান সোলার প্যানেল প্রকল্প জনপ্রিয় হচ্ছে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে খুবই জোর দিয়েছে।

প্রযুক্তি খাতের বিকাশ ও ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি সন্তোষজনক। প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান শক্তি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুবিধা কাজে লাগাতে সরকার ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে কাজ করছে। দেশজুড়ে ফাইবার অপটিক ক্যাবল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ৫জি প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক চালুর মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৩৯টিরও বেশি হাই-টেক পার্ক এবং সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে, যা তরুণ আইটি পেশাদারদের কর্মসংস্থান এবং বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। 

বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়। সফটওয়্যার ও আইটি সেবা রপ্তানি করে দেশ প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম দেশের প্রান্তিক মানুষকেও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় এনেছে। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। এ এনার্জি অ্যানালিটিক্স লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে। স্মার্ট চার্জিং স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে পরিবহন খাতে জ্বালানি তেলের নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আরও দক্ষ ও আধুনিক হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎ অপচয় ও সিস্টেম লস কমাতে দেশজুড়ে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হচ্ছে। লোডশেডিং এবং সিস্টেম ক্র্যাশ এড়াতে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইন্টারনেট অফ থিংস এর মাধ্যমে ‘স্মার্ট গ্রিড’-এ রূপান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করতে পারলে ও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে স্মার্ট এনার্জির বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং দক্ষ আইটি জনবলের অভাব, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য পর্যাপ্ত ভূমির স্বল্পতা মতো বিষয়গুলোতে তীক্ষ্ণ নজর দিতে হবে। কয়লা, তেল এবং গ্যাসের মতো সনাতন জ্বালানি পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করে।

টেকসই ভবিষ্যতের জন্য সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ এবং ভূ-তাপীয় শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এছাড়া কম বিদ্যুৎ খরচ করে এমন যন্ত্রপাতি (যেমন: এলিডি লাইট, ইনভার্টার এসি) ব্যবহার করা দরকার। শিল্প ক্ষেত্রে আধুনিক ও দক্ষ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে কম জ্বালানিতে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করা কার্যকরি একটি পদক্ষেপ হতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় বায়ু ও পানি দূষণ কমানো সম্ভব, যা জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। 

টেকসই জ্বালানি নীতি গ্রহণ করলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়। নিজস্ব নবায়নযোগ্য উৎসের উন্নয়ন করলে জ্বালানি আমদানির পেছনে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়। সৌর প্যানেল স্থাপন, বায়ুকল রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি খাতে লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। সবুজ কর্মসংস্থান দেশকে এগিয়ে নেবে। উৎপাদিত পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ দক্ষতার সাথে সংরক্ষণ এবং বণ্টনের জন্য উন্নত ব্যাটারি ও স্মার্ট গ্রিড সিস্টেমের উন্নয়ন প্রয়োজন। হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল এবং জৈব জ্বালানির মতো উদীয়মান প্রযুক্তিগুলো আগামী দিনে পরিবহন খাতকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।

ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত বিনিয়োগ, নীতি সহায়তা এবং তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলার মাধ্যমেই আগামীর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ও উন্নত বিশ্বের চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান শর্ত। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, পরিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার ক্ষেত্রে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  জ্বালানি   প্রযুক্তি   খাত   উন্নয়ন   বর্তমান   পরিস্থিতি   আগামী   সম্ভাবনা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close