সংসারে অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী। মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই জরাজীর্ণ টিনের ঘর। বৃষ্টি হলেই চালের ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে ঘরের ভেতরে। সামনে শীত, অথচ ঘর মেরামত করার সামর্থ্য নেই। দুই বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর থেকে একাই চলছে ৬৫ বছর বয়সী রওশানারার জীবনসংগ্রাম। বয়সের ভার আর অসুস্থ শরীর নিয়েও থেমে নেই তার বেঁচে থাকার চেষ্টা। পাঁচ বছর আগে মাত্র এক হাজার টাকায় একটি ছাগল কিনে লালন-পালন শুরু করেছিলেন। সেই একটি ছাগল থেকেই ধীরে ধীরে তার সংগ্রহে এসেছে আটটি ছাগল। এখন এই ছাগলগুলোই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।
কিন্তু অসুস্থ শরীর নিয়ে ছাগলগুলোর দেখাশোনা করাও দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, ভাঙা ঘরের চাল মেরামত করাও জরুরি। তাই শেষ সম্বল আটটি ছাগলের মধ্যে দুটি বিক্রি করে নতুন টিন কিনে ঘরটি মেরামত করতে চান রওশানারা। ইতিমধ্যে একজন ক্রেতা দুটি ছাগলের দাম ১৬ হাজার টাকা দিতে চেয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে ঘরের চাল মেরামত করে বাকি ছাগলগুলো নিয়ে কোনোমতে জীবন চালিয়ে যেতে চান তিনি।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার নারান্দী ইউনিয়নের সনমানিয়া গ্রামের বাসিন্দা রওশানারা। তিনি মৃত তাজুল ইসলামের স্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে নিজের খরচ নিজেই চালানোর চেষ্টা করছেন। অভাবের সংসারে নেই স্বস্তি, অসুস্থ শরীর নিয়েও মিলছে না বিশ্রাম। তবু অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের উপার্জনে বেঁচে থাকতে চান এই নারী।
একটি ছাগল থেকে আটটি
রওশানারার জীবনসংগ্রামের শুরু প্রায় পাঁচ বছর আগে। তখন মাত্র এক হাজার টাকা দিয়ে একটি ছাগল কিনেছিলেন তিনি। যত্ন করে ছাগলটি লালন-পালন করতে থাকেন। একসময় ছাগলটির বংশবৃদ্ধি হয়। প্রথমে দুটি, পরে চারটি এবং এরপর আরও দুটি বাচ্চা জন্ম দেয়। এভাবেই ধীরে ধীরে তার ছাগলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আটটিতে। বর্তমানে তার চারটি ছাগী ও চারটি খাসি রয়েছে।
এই ছাগলগুলোই তার আয়ের প্রধান অবলম্বন। ছাগল পালন করে সংসারের খরচ জোগানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু বয়সের ভার আর অসুস্থতা এখন তার সেই চেষ্টাকে কঠিন করে তুলেছে। কয়েক দিন ধরে পেটের ব্যথায় ভুগছেন রওশানারা। ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারছেন না। তারপরও ছাগলগুলোর খাবার জোগাড় ও দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাঁকে।
বৃষ্টিতে ভেজে ঘর, একই ছাদের নিচে ছাগল
রওশানারার বসতঘরটির টিনের চাল দীর্ঘদিনের পুরোনো। বিভিন্ন স্থানে টিন ভেঙে যাওয়ায় বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। এই ঘরেই কোনো রকমে রাত কাটান তিনি। আলাদা করে ছাগল রাখার ঘর না থাকায় একই ঘরে আশ্রয় নিতে হয় আটটি ছাগলকেও।
সামনে শীত। তার আগেই ঘরের চাল মেরামত করা প্রয়োজন। কিন্তু নতুন টিন কেনা ও শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার মতো টাকা তাঁর হাতে নেই। তাই বাধ্য হয়েই দুটি ছাগল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একজন ক্রেতা ছাগল দুটি ১৬ হাজার টাকায় কিনতে চেয়েছেন। দুই দিনের মধ্যে ছাগল দুটি বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে ঘরের চাল মেরামত করতে চান তিনি।
শুধু ঘর মেরামত করাই নয়, ভবিষ্যতে কিছু টাকা জমিয়ে জমি বন্ধক নিয়ে ধান চাষ করারও পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তবে বয়স ও অসুস্থতার কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবু নিজের উপার্জনে বাকি জীবনটা কাটানোর ইচ্ছা ছাড়েননি রওশানারা।
‘ছাগলগুলো ছাড়া আমার আর কেউ নেই’
নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে রওশানারা বলেন, “প্রথমে এক হাজার টাকা দিয়ে একটা ছাগল কিনে লালন-পালন শুরু করি। সেই ছাগল প্রথমে দুটি বাচ্চা দেয়। পরে চারটি, এরপর আরও দুটি বাচ্চা দেয়। এভাবেই এখন আমার আটটি ছাগল হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ছাগী আর চারটি খাসি। এই ছাগলগুলোই এখন আমার সব।”
ঘরের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি যে ঘরে থাকি, সেই ঘরের অবস্থা খুবই খারাপ। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। শীতও চলে আসছে। ঘরটা ঠিক করা খুব দরকার। তাই দুটি ছাগল বিক্রি করার কথা ভাবছি। একজন দুটি ছাগলের দাম ১৬ হাজার টাকা দিতে চেয়েছেন। দুই দিনের মধ্যে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে ঘরের নতুন টিন লাগাব। ঘর ঠিক করতে কামলার খরচও লাগবে।”
অসুস্থ শরীর নিয়ে ছাগল সামলানোর কষ্টের কথাও জানান তিনি। রওশানারা বলেন, “আমি যে ঘরে থাকি, সেই ঘরেই ছাগলগুলো থাকে। আলাদা করে রাখার মতো ঘর বানাব কীভাবে? এই ছাগলগুলো ছাড়া আমার আর কেউ নেই। ওরাই আমার সঙ্গী। এখন আর আগের মতো ছাগলগুলোকে খাওয়াতে পারি না। আমিও অসুস্থ। কয়েক দিন ধরে পেটে ব্যথা, ঠিকমতো হাঁটতে পারি না। ছাগলগুলো ছেড়ে দিলে বিভিন্ন দিকে চলে যায়। এই অসুস্থ শরীর নিয়ে ওদের পেছনে দৌড়াতে পারি না।”
কথার একপর্যায়ে নিজের শেষ বয়সের চাওয়া তুলে ধরে তিনি বলেন, “আজ এত রোদ আর গরমের মধ্যেও বাইরে আসছি। শরীর ভালো না, তবু তো চলতে হবে। এখন নিজের খরচ নিজেকেই চালাতে হয়। আমি চাই, মরার আগে যেন কারও কাছে ভিক্ষা করতে না হয়। দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে চাই। যত দিন বেঁচে আছি, নিজের মতো করে চলতে চাই।”
সহায়তার আহ্বান স্থানীয়দের
স্থানীয় বাসিন্দা আতাউল রহমান বলেন, “রওশানারা অনেক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বয়স হয়েছে, শরীরও ভালো না। তারপরও আটটি ছাগল লালন-পালন করে কোনোভাবে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। তার ঘরটির অবস্থাও খুব খারাপ। ঘরের চাল মেরামত করার সামর্থ্য না থাকায় দুটি ছাগল বিক্রি করার কথা ভাবছেন। আমরা চাই, সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়ান, যাতে তিনি একটু ভালোভাবে থাকতে পারেন।”
প্রতিবেশী ঝুমা আক্তার বলেন, “তিনি দীর্ঘদিন ধরে অভাব-অনটনের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। নিজের কষ্টের কথা কাউকে তেমন বলেন না। অসুস্থ শরীর নিয়েও ছাগলগুলো দেখাশোনা করেন। তাঁর ঘরের চাল জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির সময় ঘরে থাকা কষ্টকর হয়ে যায়। ঘরটি মেরামত করার জন্যই তিনি দুটি ছাগল বিক্রি করতে চাইছেন। আমরা চাই, কেউ এগিয়ে এসে তাকে সহযোগিতা করলে শেষ বয়সে অন্তত একটু শান্তিতে থাকতে পারবেন।”
নারান্দী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. মানিক মিয়া বলেন, “রওশানারা অত্যন্ত অসহায়। তার স্বামী দুই বছর আগে মারা গেছেন। সন্তান-সম্পত্তি না থাকায় জীবিকা নির্বাহের জন্য তাকে ছাগল পালনের পরামর্শ দিই। একটি ছাগল দিয়ে শুরু করে এখন তার ছাগলের সংখ্যা প্রায় আটটি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও তাঁকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ছাগল পালন করে এখন তিনি মোটামুটি আয় করছেন এবং নিজের সংসার চালাতে পারছেন।”
নারান্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মুছলেহ উদ্দিন বলেন, “রওশানারাকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। তিনি ছাগল পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সম্প্রতি তাঁর হাতে এক বস্তা চাল, ডাল, চিনি, লবণ ও তেলসহ শুকনো খাবার তুলে দেওয়া হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, যারা কোনো ভাতার আওতায় নেই, তাঁদের উপযুক্ত ভাতার আওতায় আনার পাশাপাশি হতদরিদ্রদের টিসিবি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়।”
কেকে/সাশ