বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ। নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আসনটির ১৮৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে মাঠে মোতায়েন ছিলেন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৫ হাজার ৩০০ সদস্য। পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে ২১ প্লাটুন বিজিবি এবং এসআরবি-১৩-এর আটটি টহল দল।
বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, ধানের শীষের প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দেলাওয়ার হোসেনের চেয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।
প্রাপ্ত ফলাফলে দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৪৫০ ভোট। অন্যদিকে, মির্জা ফয়সল আমীন পেয়েছেন ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ ভোট। এ ছাড়া বটগাছ প্রতীকের আব্দুল আলীম নিজামী পেয়েছেন ৮৩৬ ভোট, হাতপাখা প্রতীকের খাদেমুল ইসলাম পেয়েছেন ৩ হাজার ২৮৮ ভোট এবং ডাব প্রতীকের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক পেয়েছেন ৪৪৯ ভোট। বাতিল ভোটের সংখ্যা ৫ হাজার ১৬৩।
বিজয়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রার্থী ও দলীয় নেতাকর্মীরা মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এক সংবাদ সম্মেলনে বিজয়ী প্রার্থী বলেন, ‘এই বিজয় জনগণের গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের বিজয়।’
এদিকে, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম, জালিয়াতি ও কারচুপির অভিযোগ তোলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন।
জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন কেন্দ্রে জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এজেন্টদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। দিনভর ব্যালট পেপার ছিনতাই এবং ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নির্বাচন কমিশনের কাছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণের দাবি জানানো হলেও তা রক্ষা করা হয়নি বলে দাবি করেন এই প্রার্থী।
সরেজমিনে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে ভোটারদের শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে দেখা গেছে। কোথাও সহিংস পরিস্থিতি চোখে পড়েনি। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভোটারদের পরিচয় যাচাই করে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
দিনের শুরুতে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন বয়সী ভোটারের উপস্থিতিতে কেন্দ্রগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রথমবার ভোট দেওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে কেউ কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। আবার অনেকে আট মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
রিয়াজ মাহমুদ নামে এক তরুণ ভোটার বলেন, “যদিও এটি উপনির্বাচন, কিন্তু জীবনের প্রথম ভোট দিতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে।”
অপু নামে আরেক ভোটার বলেন, “বিগত সরকারের আমলে আমি ভোটার হলেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারিনি। কিন্তু এবার আট মাসের ব্যবধানে দুইবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এটা আমার জন্য সত্যিই আনন্দের। কখনো ভাবিনি, একই আসনে কয়েক মাসের ব্যবধানে দুইবার ভোট দিতে পারব। আগে শুনেছি, ভোটাররা ঠিকভাবে ভোট দিতে পারতেন না, কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই তাঁদের ভোট দেওয়া হয়ে যেত। কিন্তু এবার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট নিজে দিতে পেরেছি, তাও আবার কয়েক মাসের ব্যবধানে দুবার।”
সোহেনী রায় নামে এক সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটার বলেন, “আগে ভোটের সময় অমুককে ভোট দিতে হবে, তমুককে ভোট দিতে হবে—এমন চাপ দেওয়া হতো। কিন্তু এবার সেটা দেখা যায়নি। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে।”
উপনির্বাচন ঘিরে ভোটকেন্দ্রগুলোতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশের পাশাপাশি মাঠে দায়িত্ব পালন করেন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৭৫ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন।
এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন পাঁচজন প্রার্থী। তারা হলেন বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ডা. খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।
কেকে/ এমএস