সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে (গবি) দুই নারী সহপাঠীকে যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ) ঢাকা জেলা কমিটির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন রুদ্রের বিরুদ্ধে। তিনি গবির রাজনীতি ও প্রশাসন বিভাগের ৩৯ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। এদিকে এ নিয়ে অপর সহপাঠীরা প্রতিবাদ করলে ওই ঘটনাকে মারধরের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করে ফেসবুকে পোস্ট করেন তিনি। যদিও ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক শিক্ষার্থী মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানান।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরের দিকে গবি ক্যাম্পাসের পাশে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী দুই নারী শিক্ষার্থী গবির রাজনীতি ও প্রশাসন বিভাগের ৩৯ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, ফেসবুক গ্রুপের মেসেজ যাচাই ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযুক্ত সাখাওয়াত হোসেন দীর্ঘ দিন ধরেই সহপাঠীদের সঙ্গে অসদাচরণ করে আসছিলেন। সম্প্রতি তিনি নিজের ফেসবুক আইডিতে সহপাঠীদের উদ্দেশ্য করে একটি পোস্টে তাদের ’টোকাই’ বলে অভিহিত করেন ও ’অপ্রকাশযোগ্য গালি দেন। পরবর্তীতে সেই পোস্ট তিনি সরিয়ে নেন। বিষয়টি নিয়ে ৩৯ তম ব্যাচের অভ্যন্তরীণ মেসেঞ্জার গ্রুপে প্রশ্ন করা হলে সেখানে তিনি দুই নারী সহপাঠীকে অপ্রকাশযোগ্য যৌন হয়রানিমূলক গালি দেন। এসব নিয়ে অপর শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী একটি স্থানে এ নিয়ে সাখাওয়াতকে প্রশ্ন করেন ৩-৪ জন সহপাঠী। সাখাওয়াত এ সময়ও তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখান ও গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে তাকে সেখানে রেখেই অপর শিক্ষার্থীরা তাদের ক্লাসে যোগ দেন। পরে বিকেলের দিকে তারা ফেসবুকে দেখতে পান, সাখাওয়াত মারধরের অভিযোগ তুলেছেন। তবে সেখানে উপস্থিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে মারধরের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে থাকলেও তিনি ক্যাম্পাসেও কাউকে বিষয়টি অবহিত করেননি বলে জানা গেছে। যদিও এ ঘটনার পরপরই ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) একাধিক নেতা ফেসবুকে প্রতিবাদী পোস্ট দিয়েছেন।
সাখাওয়াত হোসেন রুদ্র বলেন, আমি দোকানে সিগারেট খেতে গিয়েছিলাম। তখন আমাকে ডেকে নিয়ে বলে, ‘ভাই, একটু দাঁড়াও।’ এরপর আমার ফেসবুকে দেওয়া একটা পোস্ট নিয়ে কথা বলে। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কাদের উদ্দেশে পোস্ট দিয়েছি। আমি বলেছি, তাদের উদ্দেশে পোস্ট দিইনি, অন্য কাউকে বলেছি। এরপর তারা আমাকে হুমকি দেয়। একপর্যায়ে মারধর শুরু করে। প্রায় সাত-আট মিনিট ধরে আমাকে মারধর করে। চড়-থাপ্পড়ের পাশাপাশি কিল-ঘুষিও মারে। পিঠে ও মাথায় আঘাত করে। কানের মধ্যে আঘাত লাগায় আমার কানে ব্যথা হচ্ছিল। মারধরের পর আমি সেখানে কিছুক্ষণ বসে ছিলাম। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মতো সেখানে ছিলাম। পরে একটু সুস্থ বোধ করলে সেখান থেকে চলে আসি। এরপর মাথাব্যথা করায় হাসপাতালে যাই। তবে এখনো আমি লিখিত কোনো অভিযোগ দিইনি। মাথাব্যথা থাকায় আগে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেব। চিকিৎসার প্রতিবেদন নেওয়ার পর লিখিত অভিযোগ দেব।'
তবে যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যসহ এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
যদিও মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক শিক্ষার্থী। রাজনীতি ও প্রশাসন বিভাগের ৩৯ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জিদনি ইসলাম সামি বলেন, সে সহপাঠীদের সঙ্গে প্রায় সময়ই বাজে ভাষায় খারাপভাবে কথা বলে। কয়েকজন মেয়েকেও গালাগালি করেছে বিভিন্ন সময়। এরমধ্যে কয়েক দিন আগে দুইজন মেয়েকে বাজে ভাষায় গালি দেয়। এসব নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, এসব শিখাইতে আসিস না। আমি কোন সংগঠন করি জানস? আমি কোন লেভেলে আছি জানস? আমি এসআইরেও মারছি। এসব বলে। এসবই তর্ক হইছে। তারপর তো চলে আসছি। সেখানে আরও অনেকে ছিল। কোনো মারধর হয়নি।
একই ব্যাচের অপর শিক্ষার্থী মোবারক হোসেন তানভীর বলেন, আমাদের ডিপার্ট্মেন্টের অনেকের সঙ্গে তার সমস্যা। সে সবার সঙ্গেই অপমান করে কথা বলে। কিসের ছাত্র সংগঠনের নেতা, সেই পরিচয় জাহির করে। আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই। সে ক্লাসমেটদের গালাগালি করে। কয়েক দিন আগে পোস্ট দিছে, ভার্সিটির সবাই টোকাই। আরও গালি লেখছে। সে সবসময়ই বাজে ভাষায় গালি দেয়। আমাদের দুই মেয়ে সহপাঠীকেও গালি দিয়েছে। আর মারধরের অভিযোগ হলো একটা নাটক। সেখানে বহু লোকজন উপস্থিত ছিল। আপনি সবাইকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। সবাই দেখছে। ও তো আমাদের সহপাঠী। তর্ক হইছে। কিন্তু কোনো মারধরের ঘটনা ঘটেনি। সে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বারবার বলে, আমাকে মুখে বলবি না পারলে মার। আমাদের ছিল পরীক্ষা। মারধর করবো কেনো? আচ্ছা, একটা প্রশ্ন ভাই, ঢাকা থেকে লোকজন তার মারধর নিয়ে পোস্ট করতেছে, ওর কি ক্যাম্পাসে একজনও নাই যারা ওর মারধর নিয়ে লেখবে? একজনও কি নাই? আর ঢাকার লোকজন জেনে গেলো, ক্যাম্পাসে তো তারপরও ও ছিল, ক্যাম্পাসে, ডিপার্ট্মেন্টে কি ও একটা কথা জানাতে পারলো না? এখানে কিছুই করে নাই, কারণ এখানে সবাই ওর সম্পর্কে জানে। ও যে নোংরা ভাষায় গালাগালি করে, সবার সঙ্গে বিরোধ তাই ওর সঙ্গে কেউ নাই। ওকে কোনো মারধরের ঘটনা ঘটেনি। সাংবাদিকরাও আসেন, ওর গায়ে কোনো ইনজুরি আছে কিনা। ৪-৫ লোক মারলে কি কিছুই হবে না? আমরা চলে আসার সময়ও ও সিগারেট ফুঁকছিল।
গবির ডেপুটি রেজিস্ট্রার এ কে এম সাইফুল্লাহ বলেন, 'আমি তো অফিস টাইম পুরোটা ক্যাম্পাসে ছিলাম। আমি এই ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি। যদি অভিযোগ পাই, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে এ ঘটনার পর সন্ধ্যার দিকে ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন রুদ্র। এ বিষয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক জানান, ওই ব্যক্তি মারধরের কথা জানিয়েছিলেন। তবে তার শরীরে তেমন কোনো জখমের চিহ্ন ছিল না। তাকে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার ডিউটি অফিসারের নম্বরে ফোন করলে সেখানেও সাখাওয়াত হোসেন রুদ্র নামে কেউ কোনো অভিযোগ করেননি বলে জানা যায়।
কেকে/ এমএস