শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬,
১৪ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● জাপানের শ্রমবাজারে ঢাকা কেন পিছিয়ে      ● চার দিনের জাপান সফর শেষে ঢাকার পথে প্রধানমন্ত্রী      ● এলপিজির কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব, বাড়তে পারে সিলিন্ডারের দাম      ● দুই ঘণ্টা পর মিরপুর-১০ ছাড়লেন পোশাকশ্রমিকেরা, যান চলাচল স্বাভাবিক      ● মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড      ● ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন : জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী বিএনপি প্রার্থী      ● তেল-গ্যাসে নাভিশ্বাস      
দেশজুড়ে
কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগে অনিয়মের পাহাড়, দখলে যাচ্ছে মেহেরঘোনার বনভূমি
মো. নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৬ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর, তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে যোগসাজশে বনভূমি দখল, বনায়নের গাছ কেটে পাচার, পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি এবং সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের মেহেরঘোনা রেঞ্জের বিভিন্ন বিটে এসব কর্মকাণ্ড চলছে বলে দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ধলিরছড়া ও কালিরছড়া বিট কর্মকর্তা আব্দু সামাদ এবং মেহেরঘোনা রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন। তবে তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

প্লট আকারে বনভূমি দখলের অভিযোগ

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি নথিতে যেসব জমিকে ‘জবরদখলমুক্ত’ বা ‘নতুন সামাজিক বনায়ন ক্ষেত্র’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেসব জায়গার কিছু অংশে দখলদারদের বসতি ও প্লটের সীমানা গড়ে উঠেছে। মেহেরঘোনা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সামাজিক বনায়নের জন্য নির্ধারিত জমিতে সীমানা খুঁটি স্থাপন ও যথাযথ মানচিত্র সংরক্ষণ না করার সুযোগ নিয়ে দখলদাররা জমি দখল করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া সংরক্ষিত বনভূমিতে এভাবে প্লট তৈরি ও ঘরবাড়ি নির্মাণ সম্ভব নয়। তবে জমির মালিকানা, সীমানা এবং দখলসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সরকারি নথি ও সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন।

বনায়নের গাছ কেটে পাচারের অভিযোগ

মেহেরঘোনা রেঞ্জের বিভিন্ন সামাজিক বনায়ন এলাকায় মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি ও পাচারের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নাদেরুজ্জামান উচ্চবিদ্যালয়ের পেছনে এবং ধলিরছড়া এলাকার পাশে ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সৃজিত সামাজিক বনায়নের বেশ কিছু বড় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।


এ ছাড়া ধলিরছড়া বিট কার্যালয়ের পূর্ব পাশের বাগান এবং বদিউল আলমের বাড়ির পাশের নুরুল আলম সওদাগর, নুরুল আজিম ও মোস্তাকের বাগান নামে পরিচিত কয়েকটি স্থান থেকেও গাছ কাটার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। নুরুল আজিমের প্লটে বাড়িঘর নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। গ্রিনবেল্টের আওতায় সৃজিত বনায়ন থেকেও গাছ কাটা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় সূত্রের।

একটি সূত্রের দাবি, সম্প্রতি মেহেরঘোনা রেঞ্জ এলাকা থেকে গাছ কেটে পাচারের সময় একটি গাড়ি থেকে ৫০ ফুটের বেশি গোল কাঠ আটক করেছে ঈদগাঁও রেঞ্জ অফিস। তবে এ ঘটনায় কাঠের সঠিক পরিমাণ, আটকের তারিখ ও স্থান এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

স্থানীয় সুফল ও সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের কয়েকজন উপকারভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাতের আঁধারে গাছ কেটে পাচার করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে তাদের অভিযোগ। বন রক্ষায় তথ্য দিলে তা গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে যায় এবং তথ্যদাতারা হুমকি ও হয়রানির শিকার হন বলেও দাবি তাঁদের।

উচ্ছেদ ও পরিচর্যার বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ

জবরদখল উচ্ছেদ ও পরিচালন ব্যয়ের নামে সরকারি বরাদ্দের প্রায় লাখ টাকা ভুয়া ভাউচার এবং নামমাত্র চারা রোপণ দেখিয়ে আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, গাছ কাটার পর কাটা গাছের গোড়া আড়াল করতে নতুন চারা রোপণ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে মেহেরঘোনা রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে এবং উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। বিট কর্মকর্তা আব্দু সামাদও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে অভিযোগ অস্বীকার করেন।

পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির অভিযোগ

মেহেরঘোনা রেঞ্জের কালিরছড়া ও ধলিরছড়া বিট এবং ভারুয়াখালী এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাতের বেলায় খননযন্ত্র ও ডাম্পার ট্রাক ব্যবহার করে পাহাড়ের মাটি কেটে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প ও নিচু জমি ভরাটের কাজে বিক্রি করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বর্ষায় পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বাড়ছে। পাহাড় কাটার প্রতিবাদ করলে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ।

সামাজিক বনায়ন ও সুফল প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ

সবুজ বনভূমি রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বাস্তবায়িত সামাজিক বনায়ন এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা) প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের মেহেরঘোনা, জোয়ারিয়ানালা, বাঘখালি ও ঈদগাঁও রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নথিপত্রে চারা রোপণ, সার প্রয়োগ ও পরিচর্যার জন্য অর্থ ব্যয়ের হিসাব থাকলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত বনায়ন দেখা যাচ্ছে না।

কিছু এলাকায় সাইনবোর্ড থাকলেও ভেতরে পর্যাপ্ত গাছ নেই বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, রোপণের সময় নিম্নমানের চারা ব্যবহার করা হয় এবং পরবর্তী পরিচর্যা ও সার প্রয়োগের বরাদ্দ যথাযথভাবে ব্যয় করা হয় না। ফলে অনেক চারা মারা যায় বা পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।

প্রকৃত উপকারভোগীদের বাদ দিয়ে অনুগত বা অস্তিত্বহীন ব্যক্তিদের নামে কমিটি গঠন, পুরোনো বা প্রাকৃতিক বনকে নতুন প্রকল্পের আওতায় দেখানো এবং পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, প্রকল্পের বরাদ্দ, ব্যয়ের হিসাব, উপকারভোগীদের তালিকা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব অবস্থা যাচাই করা হলে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সংশ্লিষ্ট পরিবেশবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের সামাজিক বনায়ন ও সুফল প্রকল্পের কাজ যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সরেজমিন পরিদর্শন প্রয়োজন। প্রয়োজনে ড্রোনের মাধ্যমে বনভূমির বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সরকারি নথির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাদের মতে, বনভূমি দখল, গাছ কাটা, পাহাড় কাটা এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এসব বিষয়ে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগের প্রমাণ চান। পরে তিনি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।


কেকে/সাশ 


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close