দীর্ঘ আট বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ননের ত্রিবার্ষিক নির্বাচন। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শ্রম অধিদপ্তরের অধীন গঠিত ‘বাচাশ্রী নির্বাচন কমিশন, ২০২৬’-এর পক্ষ থেকে এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।
কমিশনের পরিচালক ও সদস্য সচিব মোহা. আব্দুল আল আজাদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, আগামী ২৮ নভেম্বর (শনিবার) দেশের ২৩১টি চা বাগান ও পঞ্চায়েত এলাকায় এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের চা বাগান অঞ্চলগুলোতে এখন বইছে উৎসবমুখর নির্বাচনী হাওয়া।
নির্বাচন প্রক্রিয়া ও অংশীজন :
নির্বাচন কমিশন ও শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রার্থী এবং প্রায় ৬ শতাধিক প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দেশের ২৩১টি চা বাগানের প্রায় ১ লাখ চা শ্রমিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
একই দিনে বাগানের ১৫ সদস্যের পঞ্চায়েত কমিটি (সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ), সাতটি ভ্যালি এবং কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হবে। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের এই সাতটি ভ্যালি হলো—লস্করপুর, বালিশিরা, মনু-ধলাই, লংলা, জুড়ী, সিলেট এবং চট্টগ্রাম।
শ্রীমঙ্গল শ্রম অধিদপ্তরের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন জানান, ২৮ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত গোপন ব্যালটের মাধ্যমে একটানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে।
নির্বাচনী তফসিল ও গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ :
শ্রম অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বিতরণ ৬ ও ৭ নভেম্বর (সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ০৫:০০ টা পর্যন্ত), মনোনয়নপত্র গ্রহণ ৬, ০৭ ও ১০ নভেম্বর (সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ০৩:০০ টা পর্যন্ত), মনোনয়নপত্র বাছাই ১১ নভেম্বর (সকাল ১০ টা-বিকাল ৪ টা) ও ১২ নভেম্বর (সকাল ১০ টা-দুপুর ১ টা), খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ১২ নভেম্বর (বিকাল ৫ টার মধ্যে, আপিল ও শুনানি ১৩ নভেম্বর (সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত), মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ১৪ নভেম্বর (বিকাল ৩ টার মধ্যে), চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ১৫ নভেম্বর (সকাল ১১ টা), প্রতীক বরাদ্দ ১৫ নভেম্বর (দুপুর ২ টা-বিকাল ৪ টা) ও ১৬ নভেম্বর (সকাল ১০টা-বিকাল ৪ টা), ভোটগ্রহণ ও গণনা ২৮ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ শেষে তাৎক্ষণিকভাবে ভোট গণনা শুরু হবে।
(নির্বাচন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ও ফরম শ্রম অধিদপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট www.dol.gov.bd থেকে সংগ্রহ করা যাবে।)
স্থবিরতা কাটিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনে তোড়জোড় :
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার নিয়ম থাকলেও সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৪ জুনের পর আর কোনো কেন্দ্রীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। নির্ধারিত সময় ২০২১ সালে পার হয়ে গেলেও বিভিন্ন জটিলতার কারণে তা আটকে যায়। ফলে মাত্র তিন বছরের জন্য নির্বাচিত কমিটি টানা আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসায় ইউনিয়নগুলোতে স্থবিরতা নেমে এসেছিল।
তফসিল ঘোষণার পর থেকেই কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা তোড়জোড় শুরু করেছেন। কেন্দ্রীয় সভাপতি পদে রামভাজন কৈরী, রাজু গোয়ালা ও পঙ্কজ কন্দ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে নিপেন পাল ও পরেশ কালিন্দির নেতৃত্বাধীন প্যানেলগুলো নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শ্রমিকদের প্রধান প্রত্যাশা :
দীর্ঘদিন পর ভোটের সুযোগ পেয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন সাধারণ শ্রমিকরা। লাখাইছড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি ও সম্ভাব্য প্রার্থী শ্যামল বৈদ্য অভিযোগ করেন, অতীতে অনেকে নেতা হয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন।
দেওছড়া চা বাগানের রাধেশ্যাম বাউরী ও কাকিয়াছড়ার অতুল কুর্মী জানান, কেবল জয়লাভ করাই বড় কথা নয়; চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি, সময়মতো বেতন পরিশোধ, সন্তানদের সুশিক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন—এমন সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বকেই এবার বেছে নেবেন ভোটাররা
শ্রীমঙ্গল শ্রম অধিদফতরের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান জানান, আজ শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২৮ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।
প্রসঙ্গত, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে দীর্ঘ আট বছর ধরে কেন্দ্রীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৪ জুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে হিসাবে ২০২১ সালেই নতুন কমিটি নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। ফলে তিন বছরের জন্য নির্বাচিত কমিটিই টানা আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছে।
কেকে/ এমএস