বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় দিন-রাত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করলেও গত পাঁচ মাস ধরে কোনো ধরনের ভাতা পাচ্ছেন না মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী রেঞ্জের আওতাধীন তিনটি বন বিটের কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপের (সিপিজি) সদস্যরা। পারিশ্রমিক না পাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল রেঞ্জের লাউয়াছড়া, কালাছড়া ও চাউতলী বন বিটে বর্তমানে মোট ৪০ জন সিপিজি সদস্য (১০ জন নারী ও ৩০ জন পুরুষ) দায়িত্ব পালন করছেন। রোস্টার অনুযায়ী পালাক্রমে দিন ও রাত বন পাহারা দেওয়া এসব সদস্যের দৈনিক ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা। কিন্তু গত পাঁচ মাস ধরে এই সামান্য ভাতাও সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেও পারিশ্রমিক না পাওয়ায় সংসার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে সদ্য সমাপ্ত দুর্গাপূজার সময়ও ভাতা না পাওয়ায় চরম সংকটে পড়েন হিন্দু ধর্মাবলম্বী সদস্যরা। ভুক্তভোগী সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বেগম বিবি, রায়না বেগম, পারভিন বেগম, সানুরাগ মিয়া, অরুন নায়েক ও ফজল মিয়া প্রমুখ।
প্রশাসনিক জটিলতা ও নেপথ্য কারণ :
সিপিজি সদস্যদের ভাতা বন্ধ থাকার পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম লাউয়াছড়ার বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটিকে ‘অবৈধ’ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট খাতের অর্থ ছাড় করছেন না। এর ফলে শুধু সিপিজি সদস্যরাই নন, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরাও বেতন-ভাতা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পরও আগের ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমেই সিপিজি সদস্য ও স্টাফদের বেতন-ভাতা প্রদানসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। তখন কোনো সমস্যা না হলেও বর্তমানে কেন অর্থ ছাড় বন্ধ রাখা হয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈধতা নিয়ে ঠিক কী ধরনের প্রশাসনিক বা আইনগত জটিলতা রয়েছে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
বন সংরক্ষণে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা :
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও এর আশপাশের বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সিপিজি সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন পাহারা দেওয়া এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা সম্মুখসারিতে কাজ করেন। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী এসব কর্মীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বন সংরক্ষণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
বক্তব্য মেলেনি দায়িত্বশীলদের :
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এছাড়া লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সহ-ব্যবস্থাপনা সাধারণ কমিটির সভাপতি ও কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদারকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কারোরই আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে সিপিজি সদস্য ও কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির জটিলতা নিরসন করে নিয়মিত অর্থ ছাড়ের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
কেকে/ এমএস